ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের ফাউল বা খারাপ আচরণের জন্য লাল কিংবা হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। কিন্তু সাইডলাইনে বা ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা দলের কোচ কিংবা ম্যানেজার যখন মেজাজ হারান, কিংবা আচরণবিধি ভঙ্গ করেন, তখন তাঁদেরও হলুদ বা লাল কার্ড দেখতে হয়। একজন কোচ বা ম্যানেজার মাঠে এই কার্ডগুলো দেখলে তাঁদের ঠিক কী ধরনের শাস্তি পেতে হয়? মাঠের কেমন আচরণের জন্য রেফারি তাঁদের কোন কার্ড দেখান?
হলুদ কার্ডের মানে কী
হলুদ কার্ড হলো মূলত রেফারি কর্তৃক দেওয়া একটি কড়া সতর্কবার্তা। মাঠে বিভিন্ন ধরনের নিয়মভঙ্গ বা অসদাচরণের জন্য এটি দেওয়া হয়। বিপজ্জনকভাবে ট্যাকল করা, ফাউলের শিকার না হয়েও চোট পাওয়ার অভিনয় করা কিংবা ম্যাচ পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত তর্ক করা। হলুদ কার্ড পাওয়ার পর খেলোয়াড়কে সতর্ক হয়ে খেলতে হয়, কারণ আরেকটি হলুদ কার্ড দেখলেই তাঁকে মাঠ ছাড়তে হবে।
বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে নামা শিশুরা কীভাবে নির্বাচিত হয়
হলুদ কার্ডের শাস্তির নিয়ম
বিশ্বকাপে আলাদা দুটি ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড পেলে একজন খেলোয়াড় পরবর্তী এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন। তবে টুর্নামেন্টের দুটি নির্দিষ্ট ধাপে খেলোয়াড়দের কার্ডের মোট সংখ্যা আবার শূন্য বা রিসেট করে দেওয়া হয়। প্রথমবার কার্ডের সংখ্যা রিসেট করা হয় গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার পর। তাই কোনো খেলোয়াড় যদি গ্রুপ পর্বে একটি হলুদ কার্ড পান এবং এরপর নকআউট পর্বের রাউন্ড অব ৩২-এ গিয়ে আরেকটি হলুদ কার্ড পান, তবে তাঁকে নিষিদ্ধ হতে হয় না। একইভাবে দ্বিতীয়বার এই সংখ্যা রিসেট করা হয় কোয়ার্টার ফাইনাল শেষ হওয়ার পর। এর ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে একটি হলুদ কার্ড পাওয়ার পর যদি কোনো খেলোয়াড় সেমিফাইনালে আরেকটি হলুদ কার্ড পান, তাহলেও তিনি ফাইনাল ম্যাচ থেকে বাদ পড়েন না।
তবে একই ধাপের ভেতর পরপর কার্ড পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা চলে আসে। নকআউট পর্বের রাউন্ড অব ৩২-এ একটি হলুদ কার্ড পাওয়ার পর যদি কোনো খেলোয়াড় পরবর্তী রাউন্ড অব ১৬ বা কোয়ার্টার ফাইনালে আরেকটি হলুদ কার্ড পান, তবে তিনি পরের ম্যাচে নিশ্চিতভাবেই নিষিদ্ধ হবেন।
অন্যদিকে, ম্যাচ চলাকালীন খেলোয়াড়দের মতো কোচদের সরাসরি মাঠ থেকে উঠিয়ে অন্য কাউকে নামানোর সুযোগ থাকে না। তাই কোচদের ক্ষেত্রে হলুদ কার্ড পাওয়ার শাস্তি খেলোয়াড়দের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হয়। মাঠে খেলা চলাকালীন কোনো ম্যাচ অফিশিয়ালের সিদ্ধান্তের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করলে কিংবা ইচ্ছা করে খেলা শুরু করতে দেরি করলে অথবা প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে কোনো উসকানিমূলক আচরণ করলে রেফারি দলের ম্যানেজার ও কোচিং স্টাফদের হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করতে পারেন। খেলোয়াড়দের মতোই কোনো কোচ যদি একই ম্যাচে দ্বিতীয়বার হলুদ কার্ড দেখেন, তবে তা সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ডে পরিণত হয়। তাঁকে তৎক্ষণাৎ ডাগআউট ছেড়ে চলে যেতে হয়।
ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচে কার্ড জমা হওয়ার ক্ষেত্রে লিগ ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিয়মের কিছু ভিন্নতা রয়েছে। প্রিমিয়ার লিগের মতো ক্লাব ফুটবলে একজন ম্যানেজার বা কোচ আলাদা আলাদা ম্যাচে মোট তিনটি হলুদ কার্ড পেলে পরবর্তী এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন। কার্ডের সংখ্যা বাড়লে শাস্তির মেয়াদও বাড়তে থাকে। কোনো কোচ মোট ছয়টি হলুদ কার্ড পেলে দুই ম্যাচ ও নয়টি কার্ড পেলে তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন। আর কার্ডের সংখ্যা ১২টিতে পৌঁছালে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত করা হয়।
তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়মটি কিন্তু আরও কড়া। কোনো কোচ বা ম্যানেজার যদি টুর্নামেন্টের আলাদা দুটি ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড পেয়ে যান, তবে পরের ম্যাচে তিনি আর দলের সঙ্গে মাঠে বা ডাগআউটে দাঁড়াতে পারবেন না। এই এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার কারণে সবচেয়ে দরকারি সময়ে তিনি সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে খেলোয়াড়দের কোনো নির্দেশ দিতে পারবেন না।
মিসরের গোলটি বাতিল হলো কেন, ফুটবলের রুলবুক কী বলছে
লাল কার্ডের মানে কী
লাল কার্ডের অর্থ হলো ম্যাচ থেকে সরাসরি বহিষ্কার। এর জন্য আগে হলুদ কার্ড পাওয়ার কোনো দরকার নেই। বড় কোনো ভুল করলে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারেন। সাধারণত মাঠে মারামারি বা হিংস্র আচরণ করা, কাউকে গালি দেওয়া, নিশ্চিত গোল হওয়ার মুখে ইচ্ছা করে হাত দিয়ে বল আটকে দেওয়া কিংবা বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলার সময় নিয়ম ভেঙে মুখ ঢেকে রাখা।
লাল কার্ড পেলে কী হয়
বিশ্বকাপে কোনো খেলোয়াড় লাল কার্ড পেলে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ছেড়ে চলে যেতে হয়। ম্যাচের বাকি সময় তাঁর দলকে একজন কম নিয়ে খেলতে হয়। সরাসরি লাল কার্ড কিংবা দুটি হলুদ কার্ডের পর, উভয় ক্ষেত্রেই খেলোয়াড় পরবর্তী ম্যাচের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ হন। সরাসরি লাল কার্ডের ন্যূনতম শাস্তি এটা। অবশ্য পরের ম্যাচে দলটি আবার পূর্ণ ১১ জন খেলোয়াড় নিয়েই মাঠে নামতে পারে।
ক্লাব ফুটবলে অপরাধের ধরন বুঝে শাস্তির মেয়াদ আলাদা হতে পারে। কিছু লিগে মারামারির জন্য তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ফিফার নিয়মে লাল কার্ডের জন্য সাধারণত এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞাই দেওয়া হয়। তবে অপরাধ যদি অনেক বেশি গুরুতর হয়, তবে ফিফা চাইলে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়াতে পারে। ২৬ বিশ্বকাপে কাতারের আসিম মাদিবো এমন এক বিপজ্জনক ট্যাকল করেছিলেন, যার ফলে কানাডার ইসমাইল কোনের পা ভেঙে যায়। এই অপরাধে ফিফা তাঁকে পাঁচ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করে।
লুকা মদরিচ: যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফুটবলের অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্টরতবে ফিফা চাইলে বিশেষ পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এমনকি শাস্তি স্থগিতও করতে পারে। চলতি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ফিফা পুনর্বিবেচনা করে তা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ফুটবলের প্রধান নিয়ম সংস্থা আইএফএবি-এর আইন অনুযায়ী, মাঠের খেলোয়াড়দের মতো দলের কোচ ও অন্য কর্মকর্তারাও একই ধরনের শাস্তিমূলক নিয়মের অধীনে থাকেন। ২৬ বিশ্বকাপে কোনো কোচ বা ম্যানেজার লাল কার্ড পেলে তাঁকে অবিলম্বে টেকনিক্যাল এরিয়া বা সাইডলাইন ছেড়ে ড্রেসিংরুম কিংবা গ্যালারিতে চলে যেতে হবে। ম্যাচের বাকি সময়ে দলের খেলোয়াড়, সহকারী কোচ বা অন্য কোনো স্টাফের সঙ্গে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস, রেডিও বা ইশারায় যোগাযোগ করা তাঁর জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর পাশাপাশি পরবর্তী ম্যাচে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ থাকবেন। অপরাধের তীব্রতা বেশি হলে ফিফা ডিসিপ্লিনারি কমিটি তদন্ত করে আরও বেশি ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা, জরিমানা কিংবা স্টেডিয়ামে ঢোকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে।
মাঠের বেঞ্চে বসা ফুটবলার বা কর্মকর্তাদের শৃঙ্খলার জন্য একটি বিশেষ ‘বস’ নিয়ম রয়েছে। বেঞ্চে থাকা কোনো ব্যক্তি যদি লাল কার্ড পাওয়ার মতো অপরাধ করেন এবং রেফারি যদি সুনির্দিষ্টভাবে সেই অপরাধীকে শনাক্ত করতে না পারেন, তবে দলের প্রধান বা সিনিয়র কোচকে সেই অপরাধের দায় নিতে হয়। রেফারি তাঁকেই লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন।
আরেকটা নিয়ম হলো ম্যাচ বর্জনের বিরুদ্ধে। রেফারির কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে যদি কোনো খেলোয়াড় ইচ্ছা করে মাঠ ছেড়ে চলে যান, কিংবা অন্য সতীর্থদের মাঠ ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করেন, তবে তাঁকেও রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারবেন।
সূত্র: ইএসপিএন, অ্যাটলাস, ইয়াহু স্পোর্টসফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে দেখে নিতে পারো সেরা ৫ মুভি






