চলতি বিশ্বকাপে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ধ্রুবসত্যটি আবারও প্রমাণের দায়িত্ব যেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন লিওনেল মেসি, বয়স কেবলই ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর হিসাব, মেধার নয়। ৩৯ বছর বয়সে এসে যেখানে সমসাময়িক ফুটবলারদের বুট জোড়া তুলে রাখার সময় ঘনিয়ে আসে, সেখানে আর্জেন্টিনার এই মহানায়ক প্রতি ম্যাচে নতুন রূপকথার জন্ম দিচ্ছেন।
অধিনায়কের এই চিরসবুজ পারফরম্যান্সে অবশ্য অবাক হননি আলবিসেলেস্তেদের মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা, মেসি যতদিন সবুজ গালিচায় বুট ছোঁয়াবেন, ততদিন সেরাদের সেরার সিংহাসনটা তাঁর দখলেই থাকবে।
কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রবিবার (১২ জুন) সকাল ৭টায় সেমিফাইনালের টিকিট কাটার লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে মহাগুরুত্বপূর্ণ এই কোয়ার্টার ফাইনালের প্রাক-ম্যাচ সংবাদ সম্মেলনে অবধারিতভাবেই রণকৌশলের চেয়ে বেশি আলো কেড়ে নিল অধিনায়ক মেসির অবিশ্বাস্য ফর্ম আর ফিটনেস।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার তরী একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন এই জাদুকর। শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে যখন ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে বিদায়ের প্রহর গুনছিল দল, তখনই শুরু হয় মেসি-ম্যাজিক। মাত্র ১১ মিনিটের এক টর্নেডো ঝড়ে ম্যাচ ঘুরে যায় ৩-২ ব্যবধানে। মহানাটকীয় সেই প্রত্যাবর্তনের গল্পে নিজে যেমন জাল খুঁজে নিয়েছেন, তেমনি সতীর্থ ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে দিয়েও গোল করিয়েছেন।
অথচ বিশ্বমঞ্চের পর্দা ওঠার আগে এই বুড়ো হাড়ের ফিটনেস নিয়েই সবচেয়ে বেশি জলঘোলা হয়েছিল। গত মাসেই ৩৯-এ পা দেওয়া ইন্টার মায়ামির এই ফরোয়ার্ড পেশির চোট কাটিয়ে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে যোগ দেওয়ায় অনেকেই ভেবেছিলেন, টুর্নামেন্টের টানা ম্যাচগুলোর ধকল তিনি নিতে পারবেন না। সমালোচকদের সেই সংশয়কে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই উড়িয়ে দিচ্ছেন আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক।
অধিনায়কের এমন অপ্রতিরোধ্য রূপের রহস্য ফাঁস করতে গিয়ে স্কালোনি জানান, লিও নিজের প্রস্তুতি আর শরীরচর্চাকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আর্জেন্টিনা কোচের মতে, ‘লিও যেভাবে প্রতিটি ম্যাচের জন্য নিজের শরীরকে প্রস্তুত করেছে, তা সত্যিই অতুলনীয়। মাঠের পরিসংখ্যান দিয়ে ওকে মাপা ভুল হবে। আসল বিষয় হলো ওর জেদ। যখন সে বুঝতে পারে যে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার সময় এসেছে, তখন পৃথিবীর কোনো রক্ষণভাগের পক্ষেই ওকে রুখে দেওয়া সম্ভব নয়।’
মেসির বয়স নিয়ে সংশয়বাদীদের উদ্দেশ্যে স্কালোনি বলেন, যাঁরা ওঁর সাথে প্রতিদিন ড্রেসিংরুম ভাগ করেন না, তাঁদের পক্ষেই কেবল এমন অবান্তর প্রশ্ন তোলা সম্ভব। এটি কেবল একজন কোচের চশমা দিয়ে দেখা মূল্যায়ন নয়, বরং দীর্ঘদিনের চাক্ষুস অভিজ্ঞতা থেকে বলা। মেসি নিজেই নির্ধারণ করবেন যে তিনি ঠিক কতদিন বিশ্বফুটবলের চূড়ায় বসে রাজত্ব করতে চান।
কাকতালীয়ভাবে, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি হতে যাচ্ছে মেসির জন্য ভীষণ পয়মন্ত এক মাঠে। এই অ্যারোহেড স্টেডিয়ামেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে দলকে ৩-০ ব্যবধানে জিতিয়েছিলেন তিনি। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ৮ গোল নিয়ে বর্তমানে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে সবার উপরে আছেন তিনি। শুধু তাই নয়, বিশ্বমঞ্চে নিজের মোট গোলসংখ্যাকে ২১-এ নিয়ে গিয়ে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটিও এখন ওঁর দখলে।
অনুশীলনে মেসির নিবেদন নিয়ে স্কালোনি যোগ করেন, ‘আজকের দিনেও অনুশীলনে ও যেভাবে ঘাম ঝরায়, তা তরুণদের জন্য শিক্ষণীয়। আর ২৩ বছর বয়সে বার্সেলোনার জার্সিতে পেপ গার্দিওলার অধীনে ও যে কী বিধ্বংসী ফুটবল খেলত, তা যারা কাছ থেকে দেখেনি, তাদের পক্ষে এই রূপান্তর বা ধারাবাহিকতা উপলব্ধি করা অসম্ভব।’








