শীতপ্রধান দেশ নরওয়ে একসময় মূলত শীতকালীন খেলাধুলার জন্যই পরিচিত ছিল। তবে গত এক দশকে ফুটবলেও তারা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এর পেছনে রয়েছে তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে ওঠা একটি সুপরিকল্পিত ক্রীড়া উন্নয়ন ব্যবস্থা, যার ফলস্বরূপ উঠে এসেছেন আরলিং হালান্ড, মার্টিন ওডেগার্ড, আন্তোনিও নুসা, অস্কার বব, ক্রিস্টোফার আয়ার ও স্যান্ডার বার্গের মতো তারকারা।
২০২৬ বিশ্বকাপে ২৮ বছর পর অংশ নিয়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে নরওয়ে। আর এ সাফল্যের সবচেয়ে বড় মুখ হালান্ড। শেষ ষোলোতে ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে কোয়ার্টারে তুলেছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার। টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতটি।
হালান্ডের উত্থানের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত প্রতিভা নয়, বড় ভূমিকা রেখেছে নরওয়ের ক্রীড়া নীতি। ২০১৬ সালের পর দেশজুড়ে ৫০০টিরও বেশি কৃত্রিম টার্ফ মাঠ নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে তীব্র শীতের মধ্যেও শিশু-কিশোররা নিয়মিত ফুটবল খেলতে পারে।
নরওয়ের যুব ক্রীড়া ব্যবস্থা ‘Rights of Children in Sport (খেলাধুলায় শিশুদের অধিকার)’ নামে পরিচিত আটটি মৌলিক নীতির ওপর পরিচালিত হয়। এখানে প্রতিটি শিশুর খেলাধুলার অধিকার নিশ্চিত করা হয়, পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে কেউ যেন বাদ না পড়ে সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শিশুদের একাধিক খেলায় অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয় এবং খুব অল্প বয়সে একটি খেলায় বিশেষায়িত হওয়ার চাপ দেওয়া হয় না। পাশাপাশি নিরাপদ পরিবেশ, আনন্দের সঙ্গে খেলা এবং কোচদের কাছে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগও নিশ্চিত করা হয়।
এই নীতির সুফল এখন পুরো দেশ পাচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব আগদেরের এক গবেষণা অনুযায়ী, নরওয়ের ৯৩ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো যুব ক্রীড়া দলের সঙ্গে যুক্ত। বরফ গলে যাওয়ার পর দেশজুড়ে ফুটবল খেলার জোয়ার দেখা যায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুব ফুটবল টুর্নামেন্ট নরওয়ে কাপ থেকেও উঠে এসেছেন ওডেগার্ড, অস্কার বব ও নুসার মতো খেলোয়াড়রা।
এর প্রভাব শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বকাপে নরওয়ের সাফল্যে রাজধানী অসলোর রাস্তায় নেমে আসে হাজারো সমর্থক। বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন হয়, এমনকি রাজপরিবারও জাতীয় দলের সমর্থনে যোগ দেয়। নরওয়েজিয়ানদের ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে।
নারী ফুটবলেও নরওয়ের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। দেশটি ১৯৯৫ সালে নারী বিশ্বকাপ জিতেছে। আদা হেগারবার্গ ২০১৮ সালে ব্যালন ডি’অর জয় করেন, আর ক্যারোলিন গ্রাহাম হ্যানসেন ২০২৪ সালে এই পুরস্কারের ভোটে দ্বিতীয় হন।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো এবং শিশুবান্ধব ক্রীড়া নীতিই আজ নরওয়েকে নতুন ফুটবল শক্তিতে পরিণত করেছে। আর সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক এখন এরলিং হালান্ড।
আরআর/আইএইচএস/








