প্রবাসে চাকরি করার সময় টেলিভিশনে একটি কোয়েল খামারের প্রতিবেদন দেখেছিলেন শামীম আল মামুন। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, দেশে ফিরে তিনিও গড়বেন এমন একটি খামার। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে তাঁর জীবন।

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামের ওই উদ্যোক্তা শামীম এখন কোয়েলের বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রি করে মাসে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা আয় করছেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘কোয়েল শামীম’ নামে।

শামীম বলেন, ২০০৫ সালের দিকে তিনি সৌদি আরবে যান। সেখানে একটি পানির কারখানায় চাকরি করতেন তিনি। এক রাতে কাজ শেষে চ্যানেল আইয়ের শাইখ সিরাজের একটি অনুষ্ঠানে বগুড়ার একটি কোয়েল খামারের প্রতিবেদন দেখে তিনি মুগ্ধ হন। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেন, কোয়েলের খামার করার। বিদেশে বসেই খামারের নামও ঠিক করেন, নাম দেন ‘সোনার বাংলা কোয়েল খামার’। বর্তমানে খামারটির নাম ‘সোনার বাংলা সোনালী অ্যান্ড কোয়েল হ্যাচারি’।

শামীম আল মামুনের কোয়েলের খামার। গত শুক্রবার সখীপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামে

২০১১ সালে ছয় বছরের প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফেরেন শামীম। বগুড়ায় গিয়ে সেই খামার ঘুরে দেখেন, অভিজ্ঞ খামারি জামালের কাছ থেকে পরামর্শ নেন। বিয়ের পর নিজের স্বপ্নের কথা স্ত্রীকে জানালে তিনিও পূর্ণ সমর্থন দেন। ২০১২ সালের শুরুতে বাড়ির পাশে ২০ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলেন খামার। বগুড়া থেকে ৫০০টি কোয়েলের বাচ্চা এনে শুরু হয় তাঁর পথচলা। মাত্র তিন বছরের মধ্যেই খামারে কোয়েলের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তাঁর খামার দেখতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন।

২০২০ সাল পর্যন্ত কোয়েল ও ডিম বিক্রি করে ভালোই চলছিল তাঁর ব্যবসা। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারিতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন। অনেকেই তখন খামার ছেড়ে দিলেও শামীম হাল ছাড়েননি। নতুন সম্ভাবনার খোঁজে ২০২৩ সালে চালু করেন কোয়েলের হ্যাচারি।

বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার প্রজননক্ষম মা কোয়েল। প্রতিদিন এসব পাখি ১০ থেকে ১২ হাজার হ্যাচিং ডিম দেয়। হ্যাচারিতে ১৭ দিন পর সেই ডিম থেকে ফুটে বের হয় বাচ্চা। প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ কোয়েলের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের কাছে বিক্রি করেন তিনি। প্রতিটি বাচ্চা ৭ থেকে ৮ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতিটি বাচ্চায় লাভ থাকে ২ থেকে ৩ টাকা। সব মিলিয়ে মাসে তাঁর আয় হয় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা।

গত শুক্রবার খামারে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচজন শ্রমিকের সঙ্গে কাজ করছেন শামীম। কেউ পাখিকে খাবার দিচ্ছেন, কেউ ডিম সংগ্রহ করছেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে চালু করা হচ্ছে জেনারেটর। পাখির খাবার তৈরির জন্যও তিনি নিজস্ব মেশিন স্থাপন করেছেন।

শামীম বলেন, এই খামারই এখন তাঁর জীবন। ব্যস্ততার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পাই। প্রতি মাসে ভালো আয় হওয়ায় নতুন করে কাজের উৎসাহ পাই। তাঁকে দেখে সখীপুরে অন্তত পাঁচ-ছয়জন নতুন করে কোয়েলের খামার করেছেন। সারা দেশে তাঁর খামার দেখে শতাধিক খামার গড়ে উঠেছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসে খামার ঘুরে দেখেন, পরামর্শ নেন।

সাইদুর রহমান, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, সখীপুরকোয়েল পালন অল্প পুঁজিতে লাভজনক একটি উদ্যোগ। এর ডিম ও মাংস পুষ্টিকর এবং কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম। মুরগির ভ্যাকসিন দিয়েই কোয়েলের চিকিৎসা করা যায়। শামীম এ উপজেলার জন্য অনুকরণীয় একজন সফল উদ্যোক্তা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কোয়েল একটি পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক পাখি। ডিম থেকে ফোটার ছয় থেকে সাত সপ্তাহের মধ্যেই লেয়ার জাতের কোয়েল ডিম দেওয়া শুরু করে। এই কোয়েল প্রায় ১৮ মাস নিয়মিত ডিম দেয়। ব্রয়লার জাতের কোয়েল মাত্র চার সপ্তাহেই বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। একটি কোয়েল বছরে সাধারণত ২৮০ থেকে ৩০০টি ডিম দেয়।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, কোয়েল পালন অল্প পুঁজিতে লাভজনক একটি উদ্যোগ। এর ডিম ও মাংস পুষ্টিকর এবং কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম। মুরগির ভ্যাকসিন দিয়েই কোয়েলের চিকিৎসা করা যায়। শামীম এ উপজেলার জন্য অনুকরণীয় একজন সফল উদ্যোক্তা।