রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা খাদ্যগুদামে চলমান সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ, কৃষকদের হয়রানি এবং সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা উম্মে কুলসুমা খাতুনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছেন গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার। তিনি ওই নোটিশে ৭ দিনের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। ইউএনও জানিয়েছেন, কারণ দর্শনোর নোটিশের জবাব পাওয়ার পর তিনি ব্যবস্থা নেবেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, খাদ্যশস্য সংগ্রহের নীতিমালা উপেক্ষা করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সালেহ আজিজ, গঙ্গাচড়া উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা উম্মে কুলসুমা খাতুন এবং গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম খান প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের পরিবর্তে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকের মাধ্যমে ধান ক্রয় করছেন। খাদ্য বিভাগের সঙ্গে যাদের যোগসাজশে এই অনিয়ম করা হচ্ছে তারা হলেন-চাল ব্যবসায়ী (মিলার) ফজলু মিয়া, আইয়ুব আলী, জয়নাল আবেদীন, নজরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন। যাদের কৃষক হিসাবে নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগের কোনো কৃষিজমি নেই এবং সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দেওয়ার সামর্থ্য নেই। এরপরও তাদের নামেই সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই ধান সরবরাহ করছে একটি চক্র। তারা খাদ্য বিভাগের জেলা থেকে শুরু করে গুদামজাত করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের উৎকোচ দিয়ে মিলেমিশে দুর্নীতি করছেন। সম্প্রতি সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে গঙ্গাচড়ার ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতার রহমান। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন ইউএনও।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করার ক্ষেত্রে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি টনে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা উৎকোচ আদায় করা হচ্ছে। উপজেলার কৃষক মজিবর শেখ অভিযোগ করেন, ‘নিজের উৎপাদিত ধান খাদ্যগুদামে দেওয়ার জন্য এক মাস ধরে ঘুরছি। এখনো আমাকে বস্তা দেওয়া হয়নি। অথচ সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের নিয়মিত বস্তা সরবরাহ করা হচ্ছে। আমাদের বলা হচ্ছে, বস্তা এলে দেওয়া হবে। এতে সাধারণ কৃষক চরমভাবে বঞ্চিত ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।’

বক্তব্য জানার জন্য উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোছা. উম্মে কুলসুমা খাতুনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে গঙ্গাচড়া উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম খান বলেন, খাদ্যগুদামে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোনো ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ধান নেওয়া হয় না। উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

মিল ও চাতাল বন্ধ থাকার পরও কী করে সরকারি চাল সরবরাহের বরাদ্দ পেলেন এবং চাল সরবরাহ করছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে চাল ব্যবসায়ী (মিলার) ফজলু মিয়া বলেন, তিনি সরকারি নিয়ম মেনেই সরবরাহ করছেন। একই বক্তব্য জানিয়েছেন আইয়ুব আলী, জয়নাল আবেদীন ও নজরুল ইসলাম নামের তিন মিল মালিক চাল ব্যবসায়ী।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সালেহ আজিজ এ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। তার কাছে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলে তিনি বলেন, কারা খাদ্যশস্য সরবরাহ করছে, তা রাষ্ট্রীয় গোপন বিষয় তাই কোনো তালিকা দেওয়া যাবে না।