প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, “দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কৃষি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় বাজেটে এ খাতে আরো বরাদ্দ বাড়ানো উচিত।”

সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (অ্যাব) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: কৃষি উন্নয়নের রূপরেখা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

রিজভী বলেন, “৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের মধ্যে কৃষি কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। গ্রামীণ অর্থায়নের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি বড় ভূমিকা রাখবে।”

কৃষি ব্যাংক ও রাকাবের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় গ্রামীণ কৃষিঋণ কর্মসূচি চালু হয়। সে সময় কৃষকদের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একই সঙ্গে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, পাওয়ার টিলারের প্রসার, খাল খনন এবং চাল রপ্তানির মতো উদ্যোগ কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে।”

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, “চলতি বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় বাড়লেও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এই বৃদ্ধি খুব বেশি নয়।” তার মতে, অর্থনীতিতে কৃষির অবদান বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশের মধ্যে থাকলেও এটি সাত থেকে আট শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া উচিত। দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিকে কেন্দ্র করে হওয়ায় এ খাতে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “জাতীয় বাজেট ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়লেও সেই তুলনায় কৃষি খাতের বরাদ্দের বৃদ্ধি খুব বেশি নয়। সরকার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নে কৃষি খাতে আরো বরাদ্দ ও নজরদারি প্রয়োজন। অন্যথায় কৃষির কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ব্যাহত হতে পারে।”

সম্প্রতি ভিয়েতনাম সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রিজভী বলেন, “দেশটি বাংলাদেশ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন আলু নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে এবার ৩০ হাজার মেট্রিক টন দেওয়া হচ্ছে। আলুর মতো কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাজার আরো সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বিপণন সহজ হবে এবং অতিরিক্ত উৎপাদন নষ্ট হবে না।”

তিনি কৃষি গবেষণার ওপর আরো গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “দেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বিপুলসংখ্যক কৃষিবিদ বের হচ্ছেন। তাদের মেধা ও গবেষণার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষি খাতে বিদ্যমান সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে।”

কৃষিপণ্য সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে রিজভী বলেন, “আলু ছাড়াও অন্যান্য ফল ও সবজি দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের প্রযুক্তি দেশে আনা সম্ভব হলে মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হবে না।” এ বিষয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার ও উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, “পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের মতো পণ্যের উৎপাদন আরো বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। এ জন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাড়াতে হবে।”

রিজভী বলেন, ভারী শিল্পের কাঁচামাল দেশে পর্যাপ্ত না থাকলেও কৃষিই বাংলাদেশের প্রধান শিল্পভিত্তি হতে পারে।” নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্কের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলে এসব দেশ উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশেরও কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।”

“কৃষি দুর্বল হলে খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি- সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে কৃষি খাতে আরো বরাদ্দ, গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক জনবল তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন”, যোগ করেন তিনি।

এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের আহ্বায়ক কৃষিবিদ ড. কামরুজ্জামান কায়সারের সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব কৃষিবিদ শাহাদত হোসেন বিপ্লবের সঞ্চালনায় সেমিনারে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহাম্মদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থসংস্থান ও ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো. আক্তারুজ্জামান খান, দীপ্ত টেলিভিশনের হেড অব নিউজ এস. এম. আকাশসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।