টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত তিনদিন বৃষ্টি বন্ধ থাকায় পানি নেমে যাওয়াতে ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

সরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ১৩ কোটি টাকা হলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার কাছাকাছি। এরই মধ্যে ক্ষতির প্রভাব পড়েছে কাঁচাবাজারে, সবজির দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা।

আরও পড়ুন

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪৩ জেলা, ডুবেছে ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টরের ফসল

প্রাথমিক হিসাবে উপজেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। উপজেলার তিনটি দপ্তরের তথ্য মতে মোট ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। তারমধ্যে কৃষি খাতে ৮ কোটি, মৎস্য খাতে ৩ কোটি, প্রাণিসম্পদ খাতে ২ কোটি।

তবে উপজেলার এসব খাতের সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০- ৩৫ কোটির মতো। এর মধ্যে সবচাইতে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। ভারী বর্ষণে এসব খাতে ক্ষতির কারণে প্রভাব পড়েছে কাঁচা বাজারেও। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি সবজির কেজিতে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা।

jagonews24

‎উপজেলায় মৎস্য খাতে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরের সংখ্যা ১৭৬ টি। কৃষি খাতে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ধানে ১১২ হেক্টর ও সবজিতে ১৮০ হেক্টর। প্রাণিসম্পদে ঘাস চাষে ক্ষতি হয়েছে মোট ১৬০ একর জমি।

‎সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে উঁচু এলাকা। কিন্তু সেই তুলনায় পশ্চিম পাশে অনেকটা নিচু এলাকা। কয়েকদিন ধারাবাহিক ভারী বর্ষণের কারণে নিম্ন অঞ্চলগুলোতে পানির জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সমুদ্র উপকূলে অধিকাংশ স্লুইস গেট গুলো নষ্ট হওয়াতে ভারী বর্ষণে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

আরও পড়ুন

বন্যায় খাগড়াছড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত ৮ হাজার কৃষক, ক্ষতি ১২ কোটি টাকা

উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে কৃষি চাষাবাদ হয় সৈয়দপুর, বারৈয়ারঢালা, মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে। আর জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হয়েছে বেশি এই পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে। যার কারণে এসব এলাকার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্ট চাষিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‎উপজেলা সৈয়দপুর ইউনিয়নের কৃষক শাহ আলম বলেন, প্রায় ৩০ শতক জায়গার মধ্যে ঝিঙা চাষ করেছি। তার মধ্যে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু দুঃখের বিষয় যখনই ঝিঙা ধরা শুরু করেছে, ঠিক তখনই ভারী বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়াতে পুরো খেত জ্বলে যায়। উপজেলার কৃষি দপ্তর থেকে এখনো পর্যন্ত কেউ তদারকি করতে আসেনি।

‎তিনি আরও বলেন, এবারের বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার পরে ক্ষতির দৃশ্যটা অন্য ধরনের। সেটি হলো ধান ও সবজির গাছগুলো দ্রুত জ্বলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পানির সাথে বিষাক্ত কিছু এসেছে।

‎মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালি এলাকার মোহাম্মদ আইয়ুব আলী নামে এক কৃষক বলেন, এক একর ৪০ শতক জায়গা জুড়ে লাউ, চিচিঙ্গা চাষ করেছিলাম। তাতে খরচ হয়েছিল প্রায় চার লক্ষ টাকার মতো।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গুলীয়াখালি সাগর উপকূলে যেই স্লুইস গেট আছে। সেটির ছয়টি গেট আছে। তারমধ্যে চারটি নষ্ট। দুটি গেট দিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশন হওয়া সম্ভব না। তাই দলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আমার ওয়ার্ডের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন কৃষক রয়েছে। প্রতিজনের ২ লক্ষ টাকার অধিক ক্ষতি হয়েছে।

‎সৈয়দপুর ইউনিয়নের মুরগি ফার্মের খামারের মালিক সেলিম উদ্দিন বলেন, খামারে প্রায় ১০০০ মুরগির বাচ্চা তুলেছি। খামারে পানি উঠাতে তার মধ্যে প্রায় ৫০০টি মুরগির বাচ্চা মরে যায়। এতে প্রায় ক্ষতি হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা।

‎উপজেলার বারৈয়ারঢালা ইউনিয়নের মৎস্য চাষি দিপু শর্মা বলেন, তিন বন্ধু মিলে দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য চাষের সঙ্গে জড়িত। প্রায় বড় বড় দিঘি এবং পুকুর মিলে ছয়টিতে চাষাবাদ করছি। ভারী বর্ষণের কারণে সবগুলো ডুবে গেছে। যার কারণে প্রায় ছয় লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

‎কৃষিবিদ কল্পনা রহমান বলেন, মাঠ পর্যায়ে গিয়ে ক্ষতির পরিমাণ পরিদর্শন করছি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‎উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মুনতাসির বিল্লাহ ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার কল্লোল বড়ুয়া বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষি ও খামারিদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। পরে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

‎সীতাকুণ্ড উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড এর কার্যালয়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপসহকারী প্রকৌশলী হিমু মহাজন বলেন, সীতাকুণ্ড উপজেলার মধ্যে যে স্লুইস গেটগুলো আছে তার অধিকাংশ ১৯৬২ সালে নির্মিত। যার কারণে অধিকাংশ স্লুইস গেট নষ্ট হয়ে গেছে। নতুনভাবে নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদন করেছি।

এছাড়াও তিনি বলেন, উপজেলার খাল গুলো সম্পূর্ণভাবে খনন করা হলে কৃষকরা বর্ষায় সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে।

এম মাঈন উদ্দিন/এসজেডএইচ/জেআইএম