জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শহীদ আবু সাঈদ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। তাকে হত্যার বিচারের রায় কার্যকর না হওয়া, প্রতিশ্রুত উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অপূর্ণ থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন তার মা-বাবা, স্বজন এবং সহযোদ্ধারা।
দুই বছর আগে আজকের দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলনে উত্তাল ছিল রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। আন্দোলনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দেন তিনি। তার মৃত্যু সারাদেশে আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। যা রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।
শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, “আমার ছেলে দেশের মানুষের জন্য জীবন দিয়েছে। আজ মনে হচ্ছে, তার জীবনদান বৃথা হয়েছে। কারণ, যে স্বপ্ন নিয়ে সে আত্মত্যাগ করেছিল, সেই বৈষম্যহীন রাষ্ট্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তড়িঘড়ি করে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হলেও আমরা সেই রায়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না। এখন কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই রায় কার্যকর হচ্ছে না।”
তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচিত সরকার- যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে নানা আশ্বাস দিয়েছেন। তবে, বাস্তবে সেসব প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের বাড়িতে এসে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দুই বছর পরও সেসব প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। ছেলে হত্যার বিচার পাওয়া নিয়ে আমরা হতাশ।”
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “ছেলে মারা যাওয়ার সেই দিনের স্মৃতি চোখে ভাসলেই বুকটা ফেটে যায়। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আমার ছেলের কবরের পাশে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তি এসেছিলেন। অনেক বড় বড় কথাও বলেছিলেন। সেসব কথা কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এখন আর শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে আগের মতো কেউ আসে না, খোঁজখবরও নেয় না।”
তিনি নির্বাচিত সরকারের কাছে দ্রুত ছেলে হত্যার বিচারের রায় কার্যকরের দাবি জানান।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আবু সাঈদের সহযোদ্ধা জয়, আশিকুর রহমান, শামসুর রহমান সুমন জানান, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হন শহীদ আবু সাঈদ। অথচ তার হত্যা মামলার রায় কার্যকর হতেই দুই বছর পেরিয়ে যাচ্ছে।
তারা জানান, যার আত্মত্যাগের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ হয়েছে, সেই মহান ব্যক্তির হত্যার বিচারের জন্য এখনো আন্দোলন করতে হচ্ছে। এতে আমরা ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ। দ্রুত রায় কার্যকর না হলে ২৪-এর বিপ্লবের সম্মুখসারির যোদ্ধারাও নিরাপত্তাহীনতায় থাকবে।
তাদের অভিযোগ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলেও জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাদের দাবি, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে।
এদিকে আবু সাঈদ হত্যা মামলার ঘোষিত রায় এখনও কার্যকর না হওয়ায় পরিবার ও আন্দোলন-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ধীরগতি, আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতা এবং সময়ের সঙ্গে শহীদদের প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের শিথিলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধারা। তাদের মতে, যে আদর্শ ও আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আন্দোলনের সফলতা এসেছিল, ক্ষমতার রাজনীতির হিসাব-নিকাশে সেই আদর্শ আজ অনেকটাই আড়ালে চলে যাচ্ছে।
শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার বাদী ও তার বড় ভাই রমজান আলী বলেন, “আমার ভাইকে কোটা আন্দোলনে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে। দিনের আলোতে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় তড়িঘড়ি করে ঘোষণা করা হলেও আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যরা সেই রায়ে অসন্তুষ্ট ছিলাম। অথচ রায় ঘোষণার তিন থেকে চার মাস পেরিয়ে গেলেও তা কার্যকর করার কোনো অগ্রগতি নেই। এতে আমরা চরম হতাশ।”
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আবু সাঈদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাস তুলে ধরতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আশা, তার স্মৃতি ও আদর্শ নতুন প্রজন্মকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শওকাত আলী জানান, আবু সাঈদ হত্যা মামলার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং তারা মামলার আসামি হয়েছেন।
পরিবারের রায় নিয়ে অসন্তোষের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা জানি পরিবার এই রায়ে অসন্তুষ্ট। তবে, রায়টি দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।”
চলতি বছরের ৯ এপ্রিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মামলার ৩০ আসামির মধ্যে তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।








