হাঙ্গেরির নোবেলজয়ী কথাশিল্পী লাসলো ক্রাসনাহোরকাই বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে মহাজাগতিক অস্থিরতা ও মানবিক অবক্ষয়ের প্রলয়ংকরী ধ্বনি, রাজনৈতিক পচন, সভ্যতার ক্ষয় ও আধ্যাত্মিক শূন্যতার চিত্রায়ণ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন| আর তাঁর গল্প-উপন্যাসের পাতাজুড়ে এমন চিত্রায়ণের কারণেই তাকে বিশ্বসাহিত্যে ‘অ্যাপোক্যালিপসের মহাগাথাকার’ হিসেবে দেখা হয়| বিখ্যাত আমেরিকান চিন্তাবিদ সুসান সোনতাগ এ কারণেই তাকে ‘মাস্টার অব অ্যাপোক্যালিপস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন| তার মতে, লাসলো এমন একজন লেখক, যিনি বর্তমান জগৎকে তার চূড়ান্ত পতনের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে দেখতে সক্ষম| জেমস উড লাসলোর এই অ্যাপোক্যালিপ্টিক চিত্রবিস্ফোরণকে ‘মহাজাগতিক উদ্বেগ’ বলে বর্ণনা করেছেন| তাঁর মতে, লাসলোর গদ্য আমাদের সেই ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি করে, যা আমরা সচরাচর এড়িয়ে চলি|‘ডিস্টোপিয়ান’— কেবল এই শব্দ দিয়েই লাসলোর সাহিত্যরূপকে ধরা যায় না, বরং তার সাহিত্য একধরনের মেটাফিজিক্যাল অ্যাপোক্যালিপস, যেখানে পৃথিবী শুধু ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে না, মানুষ ধ্বংসের মধ্যেই, প্রলয়ের মধ্যেই বসবাস করছে| এখানে লাসলোর নিজের বক্তব্যই প্রণিধানযোগ্য, ‘অ্যাপোক্যালিপস কোনো ভবিষ্যৎ মহাবিপর্যয় বা কিয়ামত নয়... এর অস্তিত্ব বর্তমানেই বিরাজমান|’ আরেক জায়গায় তিনি বলেন, আমরা সব সময়ই অ্যাপোক্যালিপসের ভেতরেই বাস করছি| অর্থাৎ তার মতে, মানবসভ্যতা কখনোই পুরোপুরি সুস্থ ছিল না, বরং তা উত্থান-পতন, ধ্বংস-গড়া, মহাবিপর্যয়-মহাজাগরণ— এই চক্রের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল, আছে| লাসলো মিউজিক অ্যান্ড লিটারেচারে নিজেই বলেছেন, ‘অ্যাপোক্যালিপস কখনো পুরোপুরি ঘটে না; বরং পৃথিবী যেন এক অনন্ত বিপর্যয়ের মধ্যেই আটকে আছে|’ ফলে মানুষ মানবযাত্রা থেকেই হয়তো একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় থাকে, যিনি তাদের এই মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করবেন| কিন্তু বাস্তবতা হলো, মসিহ হয়তো মাঝে মাঝে আসেন, কিন্তু সেটা বিভ্রম— ভুয়া মসিহ, আর মানুষ মরীচিকায় হাবুডুবু খায়, কিন্তু মুক্তি আর মেলে না| কাছে গেলেই সব মুক্তিকেন্দ্রই শূন্য, এক ভেলকি| এ জন্যই দ্য নিউ ইয়র্কারে জেমস উড বলেছেন, ‘ক্রাসনাহোরকাইকে পড়া যেন এমন একদল লোককে দেখা, যারা আগুন পোহাচ্ছে, কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো আগুনই নেই|’ লাসলোর এ জগৎকে ঈশ্বর-পরিত্যক্ত এক দস্তয়েভস্কিয়ান পৃথিবী হিসেবে অনেকে দেখে|লাসলোর উপন্যাসগুলোতে মহাপ্রলয়ের চূড়ান্ত দৃশ্য দেখা না গেলেও মহাজাগতিক বিপর্যয়ের আগমুহূর্তের এক শ্বাসরুদ্ধকর, হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়া পরিস্থিতির আবহ তৈরি করা হয়, যেন সামনেই আকাশ আঁধার করে নামা ভয়ংকর বিপর্যয় আসছে| এই যে দুনিয়া শৃঙ্খলা হারিয়ে ধীরে ধীরে বিশৃঙ্খলার শিঙামুখী হচ্ছে, এটা এমন এক এন্ট্রোপিক রিয়ালিজম, যেখানে মানুষ হাজারো বছরের স্থবির সময়ের ঘূর্ণিপাকে আটকে থাকে, মুক্তির অপেক্ষায় সময় ফুরায় না| যেমন লাসলোর ‘শাতানতাঙ্গো’ উপন্যাসে এক ভুয়া মসিহ গ্রামের মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করেন; ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’ বইয়ে একটি মৃত তিমি ও সার্কাসের আগমন পুরো শহরকে উন্মত্ততা ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়; ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ উপন্যাসে মহাপ্রলয় থেকে সভ্যতার স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে দেখা যায়| মানে তার উপন্যাসগুলোতে অনিবার্য ধ্বংসের অনুভূতিটাই মুখ্য হয়ে ওঠে, যেখানে মানুষ ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় মমির মতো হয়ে যেতে থাকে| আর এই ধ্বংসোন্মুখ শ্বাসরুদ্ধকর মানব সভ্যতাকে দারুণভাবে চিত্রিত করতে তিনি ব্যবহার করেন তার বাগ&ভঙ্গির মোক্ষম অস্ত্র শ্বাসরুদ্ধকর দিঘল বাক্যের অপ্রতিরোধ্য-অবাধ্য প্রবাহ| লাসলোর বাক্য যেন দীর্ঘ প্যাঁচানো সিঁড়িলাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের টেক্সটে বাক্য আসে উপচে পড়া ঝরনাধারার মতো, বাঁক খেয়ে খেয়ে যার যাত্রা সমুদ্রের দিকে| ফলে পাঠকের কাছে এই প্রবাহ ঠেকে একধরনের মনোলজিক্যাল ফ্লুইডিটির মতো| তার বাক্যের ভেতর অসংখ্য উপবাক্য, উপবাক্যের ভেতরেও অনেক উপবাক্য— যেন চিন্তার স্তরবিন্যাস| তার এ ধরনের সিনট্যাক্সকে সুইডিশ একাডেমি ‘পূর্ণচ্ছেদহীন দীর্ঘ ও পাক খাওয়া বাক্যের প্রবাহ’ বলে মত দিয়েছিল| লাসলোর বাক্যের চলনভঙ্গি সম্পর্কে ব্রিটিশ-হাঙ্গেরীয় কবি ও অনুবাদক জর্জ সির্তেশের ‘আ স্লো লাভা-ফ্লো অব ন্যারেটিভ’ কথাটি বেশ মানানসই| লাসলোর বাক্যগঠনরীতি সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত বললে বলতে হয়, তার বাক্যপ্রণালি অনেকটা এমন— দিঘল, সর্পিল, অবিরাম প্রবাহ, চেতনার স্রোত, ধীর পাঠোপযোগী, অনুচ্ছেদহীন, জটিল বিন্যাস, যার বুনন হয় কমা-সেমিকোলন দিয়ে| কখনো কখনো দেখা যায়, পুরো পৃষ্ঠায়, এমনকি কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে তিনি কেবল একটি বাক্যই লিখে চলেন| অসংখ্য শট মিলে যেমন একটা সিন হয়, তেমনি অসংখ্য উপবাক্য বা খণ্ডবাক্য একের সঙ্গে অন্য যুক্ত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্যসেতু তৈরি করে| ফলে এমন ধ্বনি-সমবায় তৈরি হয়, যাকে বলা যায় ‘হিপটোনিক অডিটরি ফ্লো’| মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত কথোপকথনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়েই লাসলো এমন বাক-প্রণালি বেছে নিয়েছেন, যেখানে ক্যাওসও বহুকণ্ঠের এক সম্মিলিত ছন্দে রূপ নেয়| তবে কারও কারও কাছে লাসলোর এ ধরনের কথনশৈলীকে ভাষাতাত্ত্বিক সন্ত্রাস হিসেবেও দেখতে পারে| কারণ, তিনি এমন বাক্যরীতি দিয়ে পাঠককে প্রচলিত পাঠ্যাভ্যাস থেকে হয়তো জোরপূর্বক বের করে আনেন|নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর লাসলো ক্রাসনাহোরকাই বলেছিলেন, ‘মানুষ কমা দিয়ে কথা বলে, দাড়ি দিয়ে নয়; দাড়ি ঈশ্বরের জন্য বরাদ্দ|’ অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন, জীবন, চিন্তা বা অভিজ্ঞতা ছোট ছোট প্যাকেট বা আলাদা আলাদা হয়ে আসে না; বরং একটি অনুভূতি আরেকটির ভেতর মিশে যায় এবং সেখানে কোনো দাড়ি থাকে না| বরং দাড়ি দিয়ে আমরা চিন্তার প্রবাহকে থামিয়ে দিই, যা আসলে কৃত্রিম| প্রকৃতিতে বা মানুষের চেতনায় আদতে কোনো ‘ফুল স্টপ’ নেই— সবই এক অনন্ত প্রবাহ| তার মতে, মানুষ কোনো কিছুর ‘চূড়ান্ত সমাপ্তি’ টানার যোগ্য নয়, বরং তার কাজ পর্যবেক্ষণ বা বর্ণনা করা, যা কমা, সেমিকোলন দিয়ে চলতে থাকে| আর তার বাক্যগুলো এমনভাবে বাঁক নেয়, যেখানে ফ্র্যাকটাল জ্যামিতির মতো ছোট ছোট অংশ মিলে বিশাল ও জটিল এক নকশা তৈরি করে| আর এই বাক&-উন্মাদনা পাঠককে একধরনের মেটাফিজিক্যাল ভার্টিগোর (মহাজাগতিক বিভ্রম) মধ্যে ফেলে দেয়|আর ঈশ্বরের কাজ হচ্ছে ফুল স্টপ বা দাড়ি টানা, অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া| লাসলো দাড়িকে অনেকটা মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে দেখেন| তাই তো তিনি জীবনের মতো প্রবহমান জায়গায় দাড়ির মতো সমাপ্তিসূচক জিনিসটা সহজে ব্যবহার করতে চান না| এ জন্য তিনি তার বাক্যকে এমন গঠন দিয়েছেন, যাতে সেটা একটা রেজিস্ট্যান্স হিসেবে কাজ করে প্রচলিত ব্যাকরণের বিরুদ্ধে, মৃত্যুর মতো স্থবিরতার বিরুদ্ধে| তার এই বাগ&ভঙ্গি ভাষার বিরুদ্ধে একধরনের চোরাবালি| ফলে তার বাক্যে প্রবেশ সহজ, কিন্তু প্রস্থান অনিশ্চিত| তার এ বাক্যগঠনের মূল দর্শন হলো— জীবন কোনো পূর্ণবিরামবিশিষ্ট কিছু নয়, বরং এক অনির্দিষ্ট কমার সমাবেশ| পূর্ণবিরাম আসে জীবনের অনন্তকালীন বিশ্রামে|লাসলোর এই দীর্ঘল বিরল সিনট্যাক্স সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে আলোচিত হচ্ছে| কেউ কেউ এই রীতিকে ‘অসহনীয় দীর্ঘশ্বাস’ বলছেন| কেউ আবার একে আধুনিক সাহিত্যের গভীরতম ধ্যানমগ্নতা হিসেবে দেখছেন| কারও কাছে তাঁর প্রতিটি দীর্ঘ বাক্য যেন একটি বিশাল ক্যাথেড্রাল বা স্থাপত্যের মতো, যেখানে অসংখ্য উপবাক্য স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে পুরো কাঠামোটিকে ধরে রাখে| অ্যাডাম থার্লওয়েল দ্য গার্ডিয়ানে লাসলোর বাক্যকে ‘স্মৃতি ও উপলব্ধির এক মহাজাগতিক ঘূর্ণি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন| নিকোলাস লেজার্ড দ্য গার্ডিয়ানে লাসলোর গদ্যশৈলীকে ‘একটি তুষারঝড়ের মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন, যা পাঠককে ঢেকে ফেলে এবং দিশেহারা করে দেয়, কিন্তু তার ভেতর লুকিয়ে থাকে এক পরম সৌন্দর্য|অনেক সমালোচক লাসলোর ঝরনাধারার মতো অবিরাম বয়ে চলা বাক্যরীতিকে ধীর লয়ের মনোযোগ দাবি করা রীতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন| তবে এই ‘স্লো-রাইটিং’ পদ্ধতি তার গদ্যে দীর্ঘ ও গম্ভীর মহিমা যুক্ত করে| দ্য ইমাজিনেটিভ কনজারভেটিভে জন হরভাটের লেখায় একে ‘অপাঠ্য ও দীর্ঘায়িত’ বলে সমালোচনা করা হয়েছে| দ্য নিউ রিপাবলিকে স্টিফেন লুরি বলেছেন, ‘এই হাঙ্গেরীয় লেখকের অত্যন্ত জটিল ও প্যাঁচানো লিখনশৈলী কিছু পাঠককে যেমন বিরক্ত করেছে, তেমনি অনেককে দূরেও ঠেলে দিয়েছে|’ তবে এটাও ঠিক, ভিন্নতর স্বাদপিপাসু অনুরাগীরা এ শৈলীকে অনন্য সৌন্দর্য ও মগ্নকর হিসেবেই দেখেন|
লাসলোর এই বাক্যরীতিকে বিপজ্জনক হিসেবেও দেখা যায়| কারণ, চরম সহিংসতাপূর্ণ এই দুনিয়াকে যখন এমন এক অরাজকতাময় সিনট্যাক্সে দেখানো হয়, তখন মানুষের মনস্তত্ত্ব আরও অস্থির হয়ে ওঠে, দুনিয়ার শৃঙ্খলাবদ্ধ পিলারগুলো কেঁপে ওঠে| কি বই কি বাস্তব দুনিয়া— কোথাও সে বাতাসের মতো শ্রান্তি দূর করা সরল পথ পায় না| তবে হ্যাঁ, মনোযোগ ও ধ্যানমগ্নতায় ফাটল ধরা এই মানবজাতি লাসলোর বইয়ে ঢুকলে সেই মনোযোগ ও ধ্যানাচ্ছন্নতা ছাড়া শেষ করতে পারবে না| ফলে তার বই একধরনের আত্মমগ্নতার গভীর মাধ্যম|








