তানজিনা আক্তার চৈতি
ফুটবলের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি বয়স তার ৩৯, অধিকাংশ কিংবদন্তি এবয়সে অবসরে আশ্রয় নেন। অথচ মেসি এখনও মাঠে নেমে প্রমাণ করে চলেছেন-প্রকৃত শিল্পীর বয়স বাড়ে, শিল্পের জৌলুস নয়। মেসিকে দেখলে আজও মনে বিস্ময় জাগে। মুখে বয়সের ছাপ, দাঁড়িতে পাক ধরা, চামড়ায় সময়ের রেখা। সময় জানান দেয় তিনি আর সেই লম্বা চুলের তরুণ নন। কিন্তু বল পায়ে নিলেই যেন সময় থেমে যায়। ড্রিবল, পাস, প্রতিটি সিদ্ধান্ত সবকিছু এখনো আগের মতোই জাদুময়।
ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালের এ রাত যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, আর্জেন্টিনার ম্যাচ শেষ বাঁশি বাজার আগে শেষ হয় না। অনেক সমর্থকের বিশ্বাস ‘শেষ ১৫ মিনিটেই সবচেয়ে ভয়ংকর আর্জেন্টিনা।’ সেই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিলেন পুনরায় জাদুকর মেসি। দুইটি নিখুঁত অ্যাসিস্টে দলকে তুলে দিলেন আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনালে। যারা ভাবছিলেন বয়স হয়তো তাকে থামিয়ে দেবে, তাদের জন্য এ ছিল নিঃশব্দ অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব।
আরও পড়ুন
আর্জেন্টিনার জার্সির পেছনে ‘১৮৯৩’ লেখার কারণ জানেন?
এই বিশ্বকাপে মেসির পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কেন তিনি এখনো সেরাদের সেরা। ৮টি গোল, ১২টি অ্যাসিস্ট, সর্বাধিক সুযোগ সৃষ্টি, সর্বাধিক বড় সুযোগ তৈরি, সর্বাধিক সফল ড্রিবল, সর্বাধিক শট অন টার্গেট, দলের হয়ে সর্বাধিক সফল ক্রস। প্রায় প্রতিটি আক্রমণাত্মক সূচকেই তিনি শীর্ষে। এমবাপ্পে, হালান্ড কিংবা হ্যারি কেইনের মতো তরুণ তারকারাও এই মুহূর্তে তার পেছনে। ফলে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল দুটি পুরস্কারের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার এখন লিওনেল মেসি।
তবে এই সেমিফাইনালের গল্প শুধু মেসির নয়। কোচ লিওনেল স্কালোনির অসাধারণ কৌশলগত বরাবরের মতোই চমৎকার। বিরতির পর রদ্রিগো ডি পলকে মাঠে নামিয়ে মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেন তিনি। এরপর মেসিকে আরও স্বাধীনভাবে ডান প্রান্তে খেলতে দেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ সেই পরিকল্পনা বুঝে ওঠার আগেই একের পর এক আক্রমণে চাপে পড়ে যায়। এনজো ফার্নান্দেজ গোল করে এগিয়ে দেন দলকে। পরে বদলি হিসেবে নামা লাউতারো মার্টিনেজ ম্যাচের নির্ধারণী গোলটি করে কোচের পরিকল্পনাকে পূর্ণতা দেন। স্কালোনির এই শান্ত, ধৈর্যশীল ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট।
আরও পড়ুন
বিশ্বকাপে বয়সের জয়গান, নাকি তারকাখ্যাতির প্রভাব
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও মেসির যাত্রা অনন্য। ২০১৪,২০১৮ ২০২২ এবং ২০২৬ চারটি বিশ্বকাপের মধ্যে তিনটির ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব এ মহাতারকার। দিয়েগো মারাদোনার উত্তরসূরি হিসেবে নয়, নিজের স্বকীয় মহিমায় তিনি এরই মধ্যেই নির্মাণ করেছেন এক নতুন ইতিহাস। সেমিফাইনালের এ ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার উপস্থিতিও ছিল অনবদ্য।
তরুণ, গতিময়, হাই-প্রেসিং ফুটবলের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী এক অভিজ্ঞ শিল্পী। মাঠে তিনি যেন বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন ফুটবল শুধু গতির নয়, বুদ্ধি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সৃজনশীলতারও খেলা। তবু আনন্দের মাঝেও একটুখানি বিষণ্নতা থেকে যায়। কারণ এটাই হয়তো বিশ্বকাপ মঞ্চে মেসির শেষ অধ্যায়। হয়তো ফাইনালের পর তিনি জাতীয় দলের জার্সিকে বিদায় জানাবেন। তখন আর দেখা যাবে না বাম পায়ের জাদু, সেই নিখুঁত থ্রু পাস, কিংবা অসাধারণ ড্রিবলিং।
আরও পড়ুন
ব্রাজিলের খেলোয়াড়কে ঘুমের ওষুধ মেশানো পানি খাইয়েছিল আর্জেন্টিনা!
কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে তাই আনন্দের পাশাপাশি জমেছে বিদায়ের অজানা কষ্টও। আজও যারা তার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাদের জন্য মেসির উত্তর কখনো কথায় নয় পারফরম্যান্সে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নয়, নিজের জবাব দেন সবুজ ঘাসের মাঠে। সমালোচনা, বিতর্ক সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, প্রকৃত কিংবদন্তির পরিচয় ট্রফিতে নয়, ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠত্বে।
শেষ বাঁশি বাজেনি এখনো। সামনে আরেকটি ফাইনাল। হয়তো আরেকটি ইতিহাস অপেক্ষা করছে। হয়তো আরেকবার উঁচু হবে সোনালি ট্রফি, হয়তো যোগ হবে গোল্ডেন বুট কিংবা গোল্ডেন বল। কিন্তু ফলাফল যাই হোক, একটি সত্য এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত-ফুটবল নামক শিল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল ক্যানভাসগুলোর একটির নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। সময় তাকে বৃদ্ধ করেছে, কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বকে নয়।
কেএসকে








