বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার মহাগুরুত্বপূর্ণ মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা শিবির। তবে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও এখন মাঠের বাইরের উত্তাপ যেন বেশি স্পর্শ করছে আলবিসেলেস্তেদের। মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে জয়ের পর থেকেই বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে বইছে সমালোচনার ঝড়।রেফারিদের কাছ থেকে আর্জেন্টিনা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন চড়া সুরকে এবার সরাসরি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন দলটির মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি। আজ ভোরে সংবাদ সম্মেলনে এসে সমস্ত বিতর্ককে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে এক পরম সত্যকে উন্মোচন করলেন তিনি।১৯৮৬ সালের সেই ছায়া ও প্রযুক্তির খাঁচায় সত্যের লড়াইরেফারিং নিয়ে সমালোচকদের ধুয়ে দিয়ে স্কালোনি বেশ কড়াভাবেই মনে করিয়ে দিলেন অতীত ইতিহাস। তিনি বলেন, "১৯৮৬ বিশ্বকাপেও মানুষ বলত আর্জেন্টিনা নাকি বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। এসব কথা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। আমার যতটুকু মনে পড়ে, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সবসময়ই এমন এক দল যাদের সবাই সমীহ করে চলে। এক অর্থে, এই সমালোচনাগুলো আমাদের খেলোয়াড়দের বোঝাতে সাহায্য করে যে, কিছু মানুষ আসলে চায় না আর্জেন্টিনা জিতুক। তবে এটা খুবই স্বাভাবিক, ঠিক যেভাবে অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও অনেকে তাদের হার দেখতে চায়। হয়তো আমাদের ক্ষেত্রে এমন মানুষের সংখ্যাটা একটু বেশিই, আর সেটা আমরা মাথায় রাখি। খেলোয়াড়রাও ব্যাপারটা বোঝে। আমরা এটাকে একটা জেদ হিসেবে নিই, যা মাঠে আমাদের আরও ভালো খেলার অনুপ্রেরণা যোগায়।"মিশরের বাতিল হওয়া গোল নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ভিএআরের যৌক্তিকতা টেনে তিনি স্পষ্ট জানান, "লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে আঘাত করা হয়েছিল। সেটা সামান্য হোক বা বেশি, নিয়ম অনুযায়ী সেটি ফাউল। এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ নেই।"আধুনিক ফুটবলের প্রযুক্তির কথা মনে করিয়ে দিয়ে স্কালোনি আরও যোগ করেন, "ভিএআরের যুগে এসে পক্ষপাতিত্ব করা খুবই কঠিন। এখানে কোনো কিছুর ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ নেই। ফুটবলে কোনো বিশেষ সাহায্য বলে কিছু নেই। ২০২৬ সালে এত প্রযুক্তির মধ্যে সেটা সম্ভবও নয়। এখন ছোট বিষয়ও সামাজিক মাধ্যমে অনেক বড় করে দেখা হয়।"ক্লান্তিকর ভ্রমণকাহিনি ও মাঠের নেপথ্য সংগ্রামখেলার বাইরেও ফুটবলারদের মানবিক ও শারীরিক ধকলের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলেন আর্জেন্টাইন বস। দীর্ঘ ভ্রমণ ও সূচি নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "আমরা ভাগ্যবান যে অন্য অনেক দলের তুলনায় কম ভ্রমণ করতে হয়েছে। গ্রুপে দ্বিতীয় হলে পুরো যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডা ঘুরে বেড়াতে হতো। একবার তো সরঞ্জাম সংক্রান্ত সমস্যায় দুই ঘণ্টার ফ্লাইটের পর বিমানবন্দরে আরও এক ঘণ্টা আটকে ছিলাম। হোটেলে পৌঁছাতে ভোর ৪-৫টা বেজে যায়। মানুষ ভাবে এসব কোনো প্রভাব ফেলে না। কিন্তু বিশ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এত ভ্রমণের পর স্বাভাবিকভাবেই খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব পড়ে।"৩৯ বছরেও চিরযৌবনা মেসি: যতদিন চাইবে, ও-ই সেরা থাকবেসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে স্কালোনির কণ্ঠে ঝরে পড়ল দলের প্রাণভোমরা ও অধিনায়ক লিওনেল মেসির প্রতি অগাধ মুগ্ধতা। ৩৯ বছর বয়সেও এই আসরে আট গোল করে কিলিয়ান এমবাপের সাথে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন মেসি। মহাতারকাকে নিয়ে স্কালোনি আবেগমথিত কণ্ঠে বলেন, "লিও প্রতি ম্যাচে কম-বেশি একই রকম দৌড়ায়। শারীরিকভাবে এটা সত্যি যে, সে তার ফিটনেস কোচের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করেছে এবং তার ফলও হাতেনাতে পাওয়া যাচ্ছে। তবে পরিসংখ্যানে তার দৌড়ানোর পরিমাণের খুব একটা হেরফের হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে নিজের সর্বোচ্চটা দিচ্ছে। যখন সে নিজের শতভাগ দেয় এবং বুঝতে পারে যে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে ফাটল ধরানো সম্ভব, তখন সে মাঠে যেন একটি অপ্রতিরোধ্য মেশিনে পরিণত হয়।"মেসির বয়সকে যারা ফুরিয়ে যাওয়ার মাপকাঠি ধরছেন, তাদের সপাটে জবাব দিয়ে মাস্টারমাইন্ড বলেন, "মেসির ফর্ম আমাকে বিন্দুমাত্র অবাক করে না। হয়তো যারা তাকে চেনে না, তারা ভেবেছিল ৩৯ বছর বয়সে এসে সে এই পর্যায়ে ফুটবল খেলতে পারবে না। তবে আমি এর আগেও বহুবার বলেছি— ও যতদিন নিজে চাইবে, ও-ই সেরা থাকবে। আমি আর্জেন্টিনার কোচ বলেই যে এ কথা বলছি, তা কিন্তু নয়।"কানসাস সিটিতে ৭২ বছর পর কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা শক্তিশালী সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষকে সমীহ করে স্কালোনি বলেন, "আমরা সবাই জানি, ফুটবলে কোনো সহজ প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই। সুইজারল্যান্ড খুবই শক্তিশালী দল। ওরা বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে লড়াই করে এবং সবসময় নিজেদের প্রমাণ করে। ওরা জিতুক বা হারুক, লড়াইটা সবসময় সমানে সমানে দেয়। বিশ্বকাপে ওদের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছে এবং শারীরিকভাবেও তারা বেশ শক্তিশালী।"সব মিলিয়ে, মাঠের বাইরে বিতর্কের জবাব আর মাঠের ভেতরে মেসির জাদুতে ভর করে সেমিফাইনালের টিকিট কাটতে পুরোপুরি প্রস্তুত আলবিসেলেস্তেরা।
রাজনীতি
‘মহাবৈরিতার’ মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্কালোনির ‘বজ্রনিঘোষ’

শেয়ার করুন







