দেশজুড়ে মাজার-খানকায় হামলা, ওরস ও কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে বিপ্লবী ছাত্র পরিষদ। একইসঙ্গে, ধর্মের নামে সহিংসতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান এবং প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা দাবি করেছে সংগঠনটি।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘কথিত তৌহিদী জনতার ব্যানারে কনসার্ট বন্ধ, মাজার-খানকায় হামলার প্রতিবাদে’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক আব্দুল ওয়াহেদ লিখিত বক্তব্যে বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশজুড়ে একের পর এক মাজার ও খানকায় হামলার ঘটনা ঘটছে। একইসঙ্গে, ওরস, কনসার্ট থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচও বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”

সুফি ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণারত প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৭টি মাজারে হামলার তথ্য পাওয়া গেছে।” চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ছয়টি হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত জুন-জুলাইয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে পবিত্র কালেমা ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর পতাকা প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা যায়। এরপর আগস্ট থেকে নতুন করে ওরস, কনসার্ট ও নৌকাবাইচবিরোধী তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করে সংগঠনটি।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনারও উল্লেখ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। এর মধ্যে গত ১৮ আগস্ট রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনে একটি গানের অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ করা হয়।

এছাড়া, ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে নির্ধারিত ব্যান্ড কনসার্ট ‘ইমাম-উলামা পরিষদ’-এর ব্যানারে আবেদনের পর জেলা প্রশাসন বন্ধ করে দেয় বলে দাবি করা হয়।

সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের চাড়ৈালিয়া গ্রামে শাহ সুফি সৈয়দ মাওলানা কাজী আফসার উদ্দিন আল-জাহাঙ্গীরের মাজারের ওরস বাতিলের দাবিও ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত কঠোর প্রশাসনিক নিরাপত্তার মধ্যে ওই ওরস অনুষ্ঠিত হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।এছাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে আগামী ১২ সেপ্টেম্বরের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ এবং সিলেটের বিয়ানীবাজারের সোনাই নদীর নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিও তোলা হয়েছে বলে জানায় সংগঠনটি।

আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, “‘তৌহিদী জনতা’ নামে যেসব হামলা ও বাধাদানের ঘটনা ঘটছে, তার সঙ্গে প্রকৃত তাওহিদ বা ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।” তিনি এসব ঘটনাকে একটি ‘উগ্রপন্থি’ চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়া সমাজচিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “বাংলার ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে সুফি-দরবেশদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ঐতিহ্য বহন করে। কিন্তু বর্তমানে সেই ঐতিহ্যের ওপর পরিকল্পিতভাবে আঘাত করা হচ্ছে।”

সংবাদ সম্মেলনে দেশের প্রধান ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতার সমালোচনা করে এটিকে ‘রাজনৈতিক ও নৈতিক ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে, এসব ঘটনার বিষয়ে তাদের স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

প্রশাসন ও সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে বিপ্লবী ছাত্র পরিষদ। সংগঠনটির অভিযোগ, হামলার আগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হামলার পর জড়িতদের বিচারের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো—কনসার্ট, নৌকাবাইচ, মাজার ও খানকায় হামলাকারীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা; ধর্মের নামে সহিংসতা বরদাশত না করার বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট ঘোষণা এবং প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা; প্রধান ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর এসব সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ; লোকসংগীত, নৌকাবাইচ ও মাজার-খানকাকেন্দ্রিক সুফি ঐতিহ্য রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; এবং ধর্মান্ধতা ও উগ্রতার বিপরীতে সহনশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক অবস্থান গ্রহণ করা।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মো. আরিফুল ইসলাম এবং জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান।