“চোখের নিমিষে বাড়িভিটা নদী খায়া গেলো। চার চারটা ঘর কোন রকমে সড়ে নিয়া গ্যাছি। ৩টা আম গাছ, ১টা জাম গাছ, কাটার আগেই নদীত ডুবি গেলো। এই শোকে দুঃখে বাড়ি ভাঙার ৩ দিন পর বাবা কাদের আলী (৬০) মারা গেলো। কোন রকমে চর বিদ্যানন্দ থাকি দক্ষিণে আনন্দ বাজারে অন্যের জমিতে ঘর উঠাইছি। আমাগো কষ্ট কেউ দ্যাখে না।”বুকের ভেতর চেপে রাখা কষ্ট এভাবেই প্রকাশ করছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে কাফি (৩৫)।সোমবার (৬ জুলাই) সরেজমিনে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে তিস্তার ভাঙনের তাণ্ডব। প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে নদীর তীব্র ভাঙন। বাড়িঘর, গাছপালা কিংবা ফসলি জমি–কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না। কৃষকের বাদাম, আমন ধানের বীজতলা, মরিচ, শাকসবজি, পাট ও ভূট্টাক্ষেত চলে গেছে নদীগর্ভে। তিস্তায় পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। প্রবল স্রোত ও বাতাসের চাপে কিছুক্ষণ পরপরই বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি।এমন পরিস্থিতিতে নদী ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে গত সোমবার তিস্তাপাড়ের দুই গ্রামের মানুষ ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করেছেন। সেখানে বক্তব্য দেন মাঈদুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম, আশরাফুল হক প্রমুখ।স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল ও মাঈদুল জানান, গত ১৫ দিনে এই দুই গ্রামের ১৯টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে চর বিদ্যানন্দের গৃহহীনরা হলেন–কাফি (৩৫), আ: জলিল (৫৫), রশিদুল ইসলাম (৩৩), গনি মুন্সী (৫০), মোতালিব (৫০), আশরাফুল (৬০), লোকমান (৫০), জয়নাল (৬০) আ: সালাম (৪৫), রফিকুল (৪৫), সফিকুল (৩০)।অন্যদিকে চর তৈয়বখাঁ গ্রামে নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন মোস্তফা কামাল (৫৫), রোস্তম (৫০), সাত্তার (৬০), জহুরুল (৪২), আইয়ুব আলী (৬৫), মোকছেদ (৪৫), রওশন আরা (৫০), ফকরুল ইসলাম (৪৫)।তৈয়বখাঁ গ্রামের রোস্তম আলী জানান, এ নিয়ে ৫ বার তার বাড়িভিটা নদীগর্ভে গেল। সেই সঙ্গে আড়াই বিঘা জমির পাট ও ধানক্ষেত বিলীন হয়েছে। বর্তমানে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিলেও এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহযোগিতা পাননি তিনি।চর বিদ্যানন্দ গ্রামের আব্দুল জলিল জানান, পূর্ব চর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মসজিদ বর্তমানে ভাঙনের মুখে। বিদ্যালয়টি বিলীন হয়ে গেলে শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। এ ছাড়া আরও অন্তত ২০০ বাড়িঘর হুমকির মুখে রয়েছে।বিদ্যানন্দ ইউপি চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম বলেন, “আমার ইউনিয়নের ৭৫ শতাংশ এলাকা মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে গ্রাম দুটি ভাঙতে ভাঙতে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সীমানায় গিয়ে ঠেকেছে।”এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, জেলাজুড়ে প্রায় ৪০টি পয়েন্টে ভাঙন চলছে। জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ৩০টি পয়েন্টে ২ লাখ জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা বাজেট না থাকায় সেখানে এখনই কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।/