মাংস সবুজ হলেই সেটা বিষাক্ত এমন সিদ্ধান্ত যেমন বৈজ্ঞানিক নয়, তেমনি শুধু দেখে নিরাপদ বলাও ঠিক নয়। প্রকৃত কারণ জানতে অবশ্যই পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করতে হবে। খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় গরুর মাংস সবুজাভ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক এবং খাদ্য নিরাপত্তা, অণুজীববিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোছা. মিনারা খাতুন।

তিনি বলেন, “খাদ্যের রং, গন্ধ বা গঠন স্বাভাবিক থাকলেই তা শতভাগ নিরাপদ এমন নয়। আবার শুধ রঙের পরিবর্তন দেখেই সেটিকে বিষাক্ত বলাও বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের মূলনীতি হওয়া উচিত, সন্দেহ হলে খাবেন না, পরীক্ষা করুন।”

সম্প্রতি পাইকগাছা পৌরসভার একটি বেকারির কর্মীরা পিকনিকের জন্য কেনা গরুর মাংস রান্না করতে গিয়ে এর কিছু অংশ সবুজ হয়ে যেতে দেখেন। পরে রান্না করা মাংসসহ কড়াই থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে এ ঘটনার কারণ সম্পর্কে এখনো কোনো পরীক্ষাগারভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

ড. মিনারা খাতুন বলেন, “মাংসের রং পরিবর্তনের পেছনে একাধিক বৈজ্ঞানিক কারণ থাকতে পারে। মাংসের স্বাভাবিক লাল রঙের জন্য দায়ী মায়োগ্লোবিন নামের রঞ্জক পদার্থ বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে সবুজাভ বর্ণ ধারণ করতে পারে। আবার সিউডোমোনাস (Pseudomonas spp.)-এর মতো কিছু ব্যাকটেরিয়া কিংবা অন্যান্য অণুজীবের বৃদ্ধির কারণেও এমন পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এছাড়া, অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, অক্সিডেশন, জবাই-পরবর্তী সংরক্ষণ ও পরিবহনের ত্রুটি কিংবা রান্নার সময় ধাতব পাত্রের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়াও সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।”

তার মতে, শুধু একদিন ফ্রিজে রাখার কারণে সাধারণত গরুর মাংস সবুজ হয়ে যায় না। সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হলে মাংসের রং কিছুটা গাঢ় বা বাদামি হতে পারে, কিন্তু স্পষ্টভাবে সবুজ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

মাংস সবুজ হলেও ঝোলের রং স্বাভাবিক থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয় বলেও জানান এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, “ঝোলের রং নির্ভর করে মসলা, মাংসের রঞ্জক পদার্থ এবং রান্নার সময় সংঘটিত বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর। ফলে মাংসের নির্দিষ্ট অংশে পরিবর্তন হলেও পুরো ঝোলের রং অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তাই শুধু ঝোলের রং দেখে মাংস নিরাপদ কি না, সে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।”

একই গরুর মাংস কিনেও অন্যদের কোনো সমস্যা না হওয়ার দাবির বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তার ভাষ্য, “একই পশুর সব অংশ একই পরিবেশে সংরক্ষিত হয় না। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা কিংবা দূষণের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। ফলে এক অংশে পরিবর্তন হলেও অন্য অংশ স্বাভাবিক থাকতে পারে। তাই এ ধরনের দাবি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেকারির কোনো রাসায়নিকের প্রভাবে মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার যে আলোচনা চলছে, সেটিরও কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে জানান তিনি। তার মতে, খাদ্যশিল্পে ব্যবহৃত অধিকাংশ রাসায়নিক সাধারণ অবস্থায় তাপের সংস্পর্শে এসে মাংসকে সবুজ করে ফেলে, এমন তথ্য এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত নয়।

ড. মিনারা খাতুন জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও গরুর মাংস, হ্যাম ও সসেজে সবুজাভ বর্ণের ঘটনা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে মায়োগ্লোবিনের রাসায়নিক পরিবর্তন, অণুজীবের বৃদ্ধি, অক্সিডেশন, আলোর প্রতিফলনজনিত ইরিডেসেন্স এবং সংরক্ষণ বা পরিবহনের ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে পরীক্ষাগারেই উত্তর মিলবে।

ভোক্তাদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, মাংসে অস্বাভাবিক সবুজ রং, দুর্গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। একইসঙ্গে নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।