চিকিৎসাসেবা নিয়ে একটা গর্ব ছিল কিউবার। দেশটির রাজধানী হাভানায় অবস্থিত উইলিয়াম সোলাম শিশু হাসপাতালে যেসব নবজাতকের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতো তার ৯০ শতাংশই বেঁচে যেত। তবে এখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই হাসপাতালের অস্ত্রোপচার বিভাগের প্রধান অ্যালিওথ ফার্নান্দেজ বলেছেন, অস্ত্রোপচারে সফলতার হার অনেক কমে গেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন এমন নবজাতকদের অর্ধেকেরও বেশি মারা গেছে।

বিশ্লেষকেরা এই পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে দায়ী করেছেন।

কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৯ জানুয়ারি কিউবার ওপর জ্বালানি অবরোধ ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ছাড়া অন্য কোনো দেশ কিউবায় জ্বালানি রপ্তানি করলে সেই দেশের ওপরও কঠোর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। ট্রাম্পের ওই ঘোষণার পরের মাসগুলোয় মাত্র একটি বিদেশি তেলবাহী ট্যাংকার কিউবায় পৌঁছেছে। ফলে দেশটিতে বিদ্যুৎ খাতে এক বিপর্যয় নেমে আসে। দেশটিতে প্রায় প্রতিদিনই লোডশেডিং হচ্ছে; যা কখনো ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে কিউবার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায়। অথচ ১৯৫৯ সালে কিউবায় বিপ্লবের পর এই খাতে দেশটি ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছিল।

কিউবার সরকারি এবং সর্বজনীন এই স্বাস্থ্যসেবা দেশটির জনগণ বিনা মূল্যে পেয়ে থাকেন। কিন্তু সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে চিকিৎসা সেবার মান যেমন কমেছে, তেমনি দেশটির জনসাধারণের মধ্যে সেবাপ্রাপ্তির হারও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। হাভানার উইলিয়াম সোলাম শিশু হাসপাতালের অস্ত্রোপচার বিভাগের প্রধান অ্যালিওথ ফার্নান্দেজ বলেন, ‘রাজনৈতিক বিরোধের বলি হচ্ছে শিশুরা। শিশুদের তো কোনো দোষ নেই। তাদের তো কোনো আদর্শ নেই। তারা তো ইচ্ছা করে একটি কমিউনিস্ট দেশে জন্ম নেয়নি।’

ফার্নান্দেজ বলেন, তাঁকে সবচেয়ে পীড়া দেয় যে বিষয়টা তা হলো–এমন মৃত্যু দেখা, যা খুব সহজেই এড়ানো যেত। শুধুমাত্র সংক্রমণের কারণে অনেকেই মারা যাচ্ছেন। আর এই সংক্রমণ হচ্ছে অপুষ্টি এবং অ্যান্টিবায়োটিকের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে।

কিউবার স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি এখন এতটা খারাপের দিকে যাচ্ছে যে কে সেবা পাবেন আর কে পাবেন না—সেটা বেছে নিতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। আর এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে। এ ছাড়া বিদ্যুতের ঘাটতিও একটি অন্যতম কারণ।

ফার্নান্দেজ বলেন, ‘যখন একটা অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে পারছি–তখন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, কাকে চিকিৎসা দেব। এই পরিস্থিতিটা অত্যন্ত কঠিন। কারণ তারা তো সবাই শিশু।’

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছে কিউবা। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে কিউবা। আধুনিক ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের শাসনামলে এই নিষেধাজ্ঞার পরিসর ও চাপ আরও বেড়েছে; যা কিউবার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে একেবারে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার তুর্ক বলেছেন, কিউবায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর অভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এমন অনেক দেশই ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারে। তবে কিউবার ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। কিউবার কর্মকর্তারা বলছেন, ইউরোপের চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারীরাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে কিউবার সঙ্গে ব্যবসা করতে চাইছে না। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক লেনদেনও কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত জানুয়ারিতে কিউবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন ট্রাম্প। এ ছাড়া দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও কঠিন করে তোলার পদক্ষেপ নেন তিনি। গত মে মাসে এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প দেশটির জ্বালানি থেকে শুরু করে আর্থিক পরিষেবা এবং খনি থেকে সম্পদ আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও পিছু হটে। ট্রাম্পের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের দুটি বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি, হ্যাপাগ-লয়েড এবং সিএমএ সিজিএম, কিউবায় তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে কিউবার সরকার দেশটির স্বাস্থ্যসেবার আওতা কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। এতে মৃত্যুর হার বেড়েছে। গত মাসে কিউবার জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ক্যানসারে শিশুদের মৃত্যুর হার ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশ হয়েছে। এর বাইরেও নবজাতকের মৃত্যুর হার ক্রমাগত বেড়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুতে ২০১৭ সালে কিউবায় প্রতি ১ হাজার নবজাতকের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হতো। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ঠিক আগে ২০২৪ সালে শিশুমৃত্যুর এই হার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বেড়েছে মাতৃমৃত্যুর হারও।

প্রাপ্তবয়স্করাও চিকিৎসাসেবা পেতে গিয়ে ভুগছেন। কিডনি জটিলতায় ভোগা এরেনিয়া ক্যারিলো (৫৭) জানিয়েছেন, একদিন পরপর তাঁর ডায়ালাইসিস করতে হয়। এখন সেই সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত মাসের কিউবার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি জটিলতার কারণে যারা ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছেন, জ্বালানি ঘাটতির কারণে তাদের চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরাও সময়মতো আসতে পারছে না। কারণ তারা প্রয়োজনীয় যানবাহন পাচ্ছেন না। হাসপাতাল থেকে রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া যাচ্ছে না বলে রোগীরা নিজেদের ওষুধের ব্যবস্থা নিজেরাই করতে বাধ্য হচ্ছেন।

গত মাসে কিউবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, দেশটিতে উৎপাদিত ৩৯৫টি ওষুধের মধ্যে ৩০০টিই এখন আর বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাব।

হাভানার চিকিৎসক রোক্সানা মার্টিনেজ বলেন, তাঁর কাছে আসা অনেক রোগীকে তিনি এখন ওষুধ দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘ওষুধের দোকানে বলতে গেলে কোনো ওষুধই নেই। কিছু রোগীর অবস্থা থাকে অত্যন্ত সংকটজনক। কিন্তু তাদের দেওয়ার মতো একটাও ওষুধ আমার কাছে থাকে না।’

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ সাবিত ইবনে আনিস খান