যুক্তরাষ্ট্রে প্রশান্ত মহাসাগরে আঘাত হেনেছে সুপার টাইফুন বাভি আঘাত। এর প্রভাবে গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে তাণ্ডব চালাচ্ছে প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও মুষলধারে বৃষ্টি।
মার্কিন ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (এনডব্লিউএস) জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই দ্বীপপুঞ্জের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় বাভির বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৯০ কিলোমিটার (১৮০ মাইল) এবং দমকা হাওয়ার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার।
এনঅ্যান্ডব্লিউএস সতর্ক করে বলেছে, ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ এই ঝড়ের কারণে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সমুদ্রের ঢেউ প্রায় ১১ মিটার (৩৫ ফুট) পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির’ খবর পাওয়া গেছে বলে এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলটি স্বভাবতই ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বীপগুলোতে এমন শক্তিশালী ঝড় সচরাচর দেখা না গেলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শক্তিশালী টাইফুনের প্রকোপ এখন আরও বাড়ছে।
সুপার টাইফুনটি আঘাত হানার আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছেন এবং শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়েছেন।
এনডব্লিউএস জানায়, গুয়াম থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে দক্ষিণে অবস্থিত জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ রোটাতে সরাসরি আঘাত হেনেছে ঝড়টি।
মেয়রের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় বাসিন্দাদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। ঘরের বাইরে থাকা অনিরাপদ।’
রোটার মেয়রের একজন মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি। এখানে তীব্র বাতাস ও বন্যা দেখা দিয়েছে।’ তিনি আরও জানান, কিছু মানুষ ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির’ কথা জানিয়েছেন।
বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) আবহাওয়াবিদ মার্কাস ল্যান্ডন এইডলেট জানিয়েছেন, রোটার উত্তরে অবস্থিত সাইপান দ্বীপের বিমানবন্দরে ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটারেরও (১০০ মাইল) বেশি বেগের দমকা হাওয়া রেকর্ড করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত এপ্রিলে গুয়াম ও নর্দান মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে আঘাত হানা আরেকটি সুপার টাইফুন ‘সিনলাকু’র কারণে দ্বীপের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছেন। ওই ঝড়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং প্রায় ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
সতর্কতা বার্তায় মার্কিন আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানায়, স্থানীয় সময় সোমবার দুপুরের আগে বাতাসের গতিবেগ টাইফুনের তীব্রতার নিচে নামার সম্ভাবনা নেই এবং মধ্যরাতের পর ছাড়া এটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের তীব্রতার নিচে নামবে না।
রোদে ঝলমলে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার জনসংখ্যার দ্বীপ গুয়ামে স্কুলগুলোতে পাঁচটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন এবং এগুলো মূলত ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় রোববার বেলা ১টায় দ্বীপের বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি আশ্রয়কেন্দ্র ইতিমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গেছে এবং বাসিন্দাদের অন্য আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী পিঙ্কি কিউবাকুব প্লাইউড দিয়ে তাঁর খাবারের দোকানের জানালাগুলো আটকে দিচ্ছিলেন। এতে ৫০০ ডলারেরও বেশি খরচ হয়েছে বলে জানান তিনি। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আমি এত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব না। এটা খুবই কষ্টের। আমি ব্যবসাটি মাত্র শুরু করেছি, এখন যা আয় হচ্ছে তা কেবল ভাড়া, ইউটিলিটি বিল, কর্মচারীদের বেতন আর মালামাল কিনতেই চলে যাচ্ছে। নিজে এখনো কোনো টাকা নিতে পারিনি।’
২৫ বছর বয়সী জাপানি পর্যটক মিকু সাকুরাই এএফপিকে বলেন, রোববারে টোকিও ফেরার ফ্লাইটটি বাতিল হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘ঝড় এলে আমরা হোটেলেই থাকব। আমি খুব ভয় পাচ্ছি।’
গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে আঘাত হানা ১১তম ক্যাটাগরি চার বা পাঁচ মাত্রার ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় হতে যাচ্ছে বাভি। এর আগের ৫৭ বছরে রেকর্ড করা মোট ঝড়ের চেয়ে এটি একটি বেশি।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় ঝড়গুলো পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সংস্থা জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার (জেটিডব্লিউসি) বাভি-কে ‘সুপার টাইফুন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।
ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটারের বেশি বেগের বাতাস থাকলে তাকে সুপার টাইফুন বলা হয়। এনডব্লিউএস-এর মতে, একটি সুপার টাইফুনের ধ্বংসক্ষমতা ক্যাটাগরি চার বা পাঁচ মাত্রার হ্যারিকেনের সমান।








