কোটাবিরোধী আন্দোলনে শকুনের থাবা থেকে দেশকে আলোর পথে নিতে অনেকেই নিজের জীবন দিয়েছেন। অনেকে আবার চোখ, হাত-পাসহ বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়ে নিজের দেহেই আন্দোলনের সাক্ষ্য বহন করছেন। তেমনই একজন আহত যোদ্ধা টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের হিমেল। জুলাই আন্দোলনের গুলি তার দুই চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। মাথায় দুই শতাধিক গুলি নিয়ে হিমেল এখনো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। পৃথিবীর আলো আর দেখবেন না জেনেও তিনি নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের মাথা গোঁজার জন্য একটি পাকা দালান দাবি করেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন যোদ্ধা জানান, জুলাই আন্দোলনে টাঙ্গাইলের ৯ জন বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন চলাকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। এছাড়া ২৭১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে হিমেলের মতো অনেকেই অঙ্গহানি হয়েছে।
হিমেল মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের গোড়াই লালবাড়ি গ্রামের মৃত আবজাল হোসেন ও নাসিমা আক্তারের ছেলে। তিনি গোড়াই উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে হিমেল মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় গোড়াই হাইওয়ে থানায় হামলা করে দুষ্কৃতকারীরা। পুলিশ তখন গুলি ছুড়তে থাকে। হিমেলের মাথা ও মুখমণ্ডলে ছররা গুলি লাগে। সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে। একাধিক হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে তার ঠাঁই হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। কিন্তু সুস্থ তিনি হননি।
সরেজমিন হিমেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কাঁচা মেঝের টিনের ঘরে তিনি শুয়ে আছেন। তার মা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দীর্ঘ সময় শুয়ে থেকে হিমেলের শরীরের বিভিন্ন অংশে ছোট ছোট ক্ষত (ঘা) হয়েছে।
নিজের জীবন নিয়ে আক্ষেপের পাশাপাশি ১১ বছর আগে বাবাকে হারানো হিমেলের পরিবার নিয়েও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। তিনি বলেন, স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে সংসারের হাল ধরার। এখন আর আমাদের দিন চলছে না। দেশের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি চোখ হারিয়েছেন, এখন সরকার তাকে দেখবে-এমনটাই তার আশা।
হিমেল বলেন, কোনো স্বার্থের জন্য আমরা জুলাই আন্দোলনে যাইনি। দেশ থেকে বৈষম্য দূর করার জন্য ও ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে দেশ এবং দেশের মানুষদের রক্ষা করতে আমরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে গুলিতে আমার দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়। আমার মাথায় এখনো দুই শতাধিক গুলি রয়েছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সহযোগিতা পেতাম। তবে বর্তমান সরকারের কাছ থেকে এখনো তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। যেহেতু আমি আর কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব না। এছাড়া কোনো কাজ করার সাধ্যও আমার নেই। তাই বিএনপি সরকারের কাছে আমার দাবি, আমাকে যেন একটি পাকা দালান নির্মাণ করে দেওয়া হয়। সেখানে আমি মা ও ভাইকে নিয়ে থাকতে পারব।
হিমেল আক্ষেপ করে বলেন, আমি চোখ হারালেও শান্তিতে ঘুমাতে পারি না। সব সময় মাথাব্যথা করে। চোখ অন্ধ হলেও জ্বালাপোড়া করে ও চুলকায়। ঠিকমতো খেতে পারি না। শরীরের বিভিন্ন অংশে চুলকিয়ে ঘা করে ফেলেছি। আমাকে যে আমার পরিবার থেকে দেখবে, সেই সাধ্যও নেই। এখন মানুষ টাকা ধারও দিতে চায় না।
হিমেলের বড় ভাই জনি মিয়া বলেন, ধারদেনা করে হিমেলের চিকিৎসা করেছি। বিভিন্ন সময় কিছু সহায়তা পেয়েছি। এখনো হিমেলের চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, মাসিক ৮ হাজার টাকা বেতনে সুতার কারখানায় চাকরি করতাম। এখন ৬ মাস ধরে বেকার বসে আছি। আমাদের পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
হিমেলের মা নাসিমা আক্তার বলেন, ৬ মাস ধরে বড় ছেলের আয়রোজগার বন্ধ। দেশ থেকে হাসিনা পালানোর পর অনেকের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও আমার হিমেলের কোনো উন্নতি হয়নি। আমার অবর্তমানে হিমেলকে কে দেখবে, সেই মানুষটা নেই। তাই হিমেলের জন্য একটা ঘর প্রয়োজন।
জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক আল আমিন বলেন, হিমেলসহ দেশের জন্য যারা আহত হয়েছেন ও জীবন দিয়েছেন, তাদের এবং তাদের পরিবারের পাশে বর্তমান সরকারের দাঁড়ানো উচিত।








