আমিনুল ইসলাম
মেয়েটা হঠাৎ করে পাশ দিয়ে এসে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরেছে! আমি বুঝতেই পারছিলাম না, কী করবো। সমুদ্রের ধারে বসে ছিলাম। মানে সমুদ্রের দিকে মুখ করে বসে আছি। মেয়েটা পাশ থেকে এসে জড়িয়ে ধরে বলছে, ‘আমি তোমার সাথে যাব।’
কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি মেয়েটা বেশ শক্ত করে আমাকে ধরে রেখেছে। কত হবে বয়স? ২২-২৩ হবে হয়তো। বেশ উঁচা-লম্বা। এখানকার মানুষজন এমনিতেই ছয়-সাড়ে ছয় ফুটের মতো হয়। চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারছিলাম না। বললাম, ‘তুমি বোধকরি ভুল মানুষের কাছে এসেছো।’
‘নাহ, আমি ঠিক মানুষের কাছে এসছি।’
এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, মেয়েটা বোধকরি ড্রাঙ্ক। কিন্তু ড্রাঙ্ক হলেও কি এতটা ড্রাঙ্ক হওয়া সম্ভব? মানে মদ খেয়ে এতটা মাতাল হওয়া যায় কি না, আমার জানা নেই। তাছাড়া ২২ বছর ইউরোপে থাকছি। জীবনে কোন দিন এমন অভিজ্ঞতা আমার হয় নাই। কোন দিন শুনিও নাই। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। কোনমতে পকেটে হাত ঢুকিয়ে ইমারজেন্সিতে ফোন দিলাম।
ফেসবুকে পাওয়া / সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, ধ্বংসই একমাত্র সমাধান
এখানে সমুদ্রসৈকতগুলোতে যেমনটা হয় আরকি। নারী-পুরুষ সাধারণত খুবই ছোট পোশাক পরে সান-বাথ (সূর্যস্নান) করে। এই মেয়েটাও ছোট পোশাক পরেই আছে। গিয়েছিলাম সমুদ্রের ভিডিও করতে। সামার উপলক্ষে পৃথিবীর সবচাইতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি; নিজের মোবাইল দিয়ে এমন একটা ভিডিও করতেই গিয়েছিলাম সমুদ্রের ধারে। এই মেয়েটা এমন ভাবে জড়িয়ে ধরেছে! রীতিমত সংকোচ হচ্ছিলো। তবে পুলিশ দেড় মিনিটের মাথায় হাজির হয়েছে।
তিনজন পুলিশ এসেছে। একজন পুরুষ, দুইজন মহিলা পুলিশ। আসার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটাকে আমার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে। এরপর কোথায় যেন নিয়ে গেল। মিনিট দুয়েক পর ফিরে এসে আমাকে পুলিশ তিনজন বলেছে, ‘আমরা খুবই দুঃখিত, তোমার সুন্দর সময়ে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য।’
আমি বললাম, ‘না না, আমি তেমন কিছু মনে করিনি।’
‘আসলে সে একটু ড্রাঙ্ক ছিল। আমরা ওকে ওর পরিবারের কাছে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছি।’
‘তোমাদের ধন্যবাদ। আমি আসলে ভিডিও করতে এসেছিলাম। চলে যাব এখন।’
এবার পুরুষ অফিসারটা বলল, ‘আমি কি তোমাকে পৌঁছে দেব?’
‘না না, আমার গাড়ি আছে সাথে।’
‘তাহলে আমি ড্রাইভ করে পৌঁছে দেই?’
একটু অবাক হলাম। পুলিশ নিজ থেকে ড্রাইভ করতে চাইছে। আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, তুমি আমার গাড়ি ড্রাইভ করতে পারো।’
সমুদ্রসৈকত থেকে বের হয়ে হাতের ডানদিকের পার্কিং লটে আমার গাড়ি রেখেছি। ওকে চাবি দিয়ে বললাম, ‘এটা এখন তোমার।’ পুলিশ অফিসারের বয়সও বেশি হবে না। ৩০ বা ৩২ হবে। সে ড্রাইভ করতে করতে বলল, ‘তোমাকে কি আর কোনভাবে সাহায্য করতে পারি?’
আমি এবার হেসে বললাম, ‘অফিসার, তুমি কি আমাকে ইজি করতে চাইছো? আমি কিন্তু ঠিক আছি। ভয় পাইনি।’
ড্রাইভ করতে করতে এবার কমবয়সি অফিসার বলল, ‘তুমি কী করো?’
‘পড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে।’
‘এ জন্যই বুঝে ফেলেছো।’
এরপর দুজনে মিলে হেসেছি। সে আমাকে আমার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়েছে। যেতে যেতে বলছিল, ‘এটা আমার দায়িত্ব। আমি স্রেফ আমার দায়িত্ব পালন করছিলাম। তুমি বিরক্ত হলে ক্ষমাপ্রার্থী।’
ফেসবুকে পাওয়া / আমেরিকার পরাজয় হয়েছে, এটি একদম পরিষ্কার
ওকে বিদায় দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছিলাম, নিজ মাতৃভূমিতে পুলিশরা মানুষজনের পকেটে ইয়াবা, গাঁজা এসব ভরে দিয়ে মামলা দিয়ে টাকা নেয়। এই তো দিন কয়েক আগের কথা, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার নাইমকে চট্টগ্রামের পুলিশ পারলে হাওয়া করে ফেলতে চেয়েছিল। জাতীয় দলের ক্রিকেটার না হলে হয়তো হাওয়া হয়েই যেত! সে নিজেই এটা বলেছে। বাংলাদেশে পুলিশ দেখলে মানুষজন ভয় পায়। আবার যাদের ভয় পায়, যাদের হাত থেকে দূরে থাকতে চায়। মানুষজন সেই পুলিশই হতে চায়! থানার ওসি থেকে শুরু করে বিসিএস ক্যাডার পুলিশদের সে কী মূল্য! এ এক আজব সমাজ।
আর আমাদের এখানে দেখুন। ফোন দেওয়ার দেড় মিনিটের মাথায় চলে এসেছে। আমাকে ড্রাইভ করে নামিয়ে দিয়ে উল্টো বলছে, ‘তোমাকে বিরক্ত করে থাকলে ক্ষমাপ্রার্থী।’ সর্বোচ্চ পরিমাণ চেষ্টা করেছে আমাকে শান্ত করার। পুরো ঘটনাটা ৫ থেকে ৭ মিনিটের। পুলিশ অফিসার আমাকে নামিয়ে দিয়ে নিজের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে ঢুকতে দূর থেকে ওকে বললাম, ‘অফিসার, তোমাকে ধন্যবাদ দিতে ভুলে গেছি। ধন্যবাদ তোমাকে।’
সেও দূর থেকে বলেছে, ‘তোমাকেও ধন্যবাদ।’
বাসায় ফিরে ভাবছিলাম, এমন দৃশ্য কি আদৌ বাংলাদেশে কল্পনা করা যায়? আহা, নিজ মাতৃভূমির পুলিশ অফিসাররা যদি এমন হতো। যাদের দেখে আমরা ভয় পাবো না। পুলিশ দেখলেই মনে হবে, অন্তত কোনো ক্ষতি হবে না। সামনে পুলিশ আছে। আহা...
লেখক: বিশ্লেষক এবং জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, এস্তোনিয়ান এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ইউনিভার্সিটি।
আরও পড়ুন
ফেসবুকে পাওয়া / এলাচিতে রং মেশাতে হচ্ছে কেন
এসইউ








