প্রকৃতির ছোট ছোট সৃষ্টি মানুষকে অনেক সময় বড় বড় সমস্যার সমাধান দেয়। কোটি কোটি বছর ধরে মৌমাছিরা নিজেদের বাসা মৌচাক তৈরিতে যে জ্যামিতিক কৌশল ব্যবহার করছে, তা প্রাকৃতিক প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন। এবার মৌমাছির মৌচাক তৈরির প্রাচীন স্থাপত্যকৌশল নকল করে মানুষের জন্য তৈরি হচ্ছে শক্তিশালী সৌর প্যানেল।

কোটি কোটি বছর ধরে মৌমাছিরা প্রকৃতির সবচেয়ে দক্ষ স্থাপত্য নকশার একটি ব্যবহার করছে। সেটি হলো মৌচাক। পরস্পর লেগে থাকা ষড়ভুজাকার বা হেক্সাগোনাল কক্ষ দিয়ে তৈরি মৌচাক অত্যন্ত শক্তিশালী ও হালকা হয়। এটি সবচেয়ে কম উপাদান ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি জায়গা তৈরি করার এক চমৎকার উদাহরণ। এখন প্রকৌশলীরা সৌর প্যানেলের নকশা নতুনভাবে তৈরি করতে মৌমাছির এই প্রাচীন নকশা ধার করছেন। তাঁরা কেবল মৌচাকের বাইরের চেহারা নকল করছেন না, ফটোভোলটাইক সিস্টেমের কাঠামোগত কর্মক্ষমতা এবং কার্যকারিতা বাড়াতে এর ভেতরের প্রকৌশল নীতিগুলো প্রয়োগ করছেন। এই কাজ বায়োমিমিক্রি নামে পরিচিত বিজ্ঞান শাখার একটি অংশ। বায়োমিমিক্রির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আধুনিক প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধানে প্রকৃতির পরীক্ষিত নকশাগুলো নিয়ে গবেষণা করেন। মৌমাছির কাছ থেকে শিখে প্রকৌশলীরা এখন হালকা, শক্তিশালী এবং বড় আকারের নবায়নযোগ্য শক্তির উপযোগী সৌর প্যানেল তৈরির আশা করছেন।

কয়েক শতাব্দী ধরে মৌচাকের নকশা বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীদের সমানভাবে মুগ্ধ করেছে। এর ষড়ভুজাকার কক্ষগুলো মৌমাছিদের সবচেয়ে কম মোম ব্যবহার করে অবিশ্বাস্যভাবে শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করতে সাহায্য করে। এই প্রাকৃতিক নকশাটি কার্যকরভাবে চাপ বা বল বিভাজন করে। এটি সহজে বিকৃত বা নষ্ট হয় না এবং এর ওজন-শক্তির অনুপাতও চমৎকার। প্রকৌশলীরা দীর্ঘদিন ধরে বিমান, মহাকাশযান এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যানবাহনে এই গুণগুলো ব্যবহার করে আসছেন। এখন এই একই নীতি সৌরশক্তিতে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজির এনার্জি অ্যান্ড ন্যানো টেকনোলজি গ্রুপের বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে প্রথাগত গ্লাস-অ্যান্ড-ব্যাকশিট নকশার পরিবর্তে অ্যালুমিনিয়াম মৌচাক স্যান্ডউইচ কাঠামো ব্যবহার করে হালকা ওজনের ফটোভোলটাইক মডিউল তৈরি করেছেন। এই মৌচাক কোরটি প্যানেল তৈরিতে প্রয়োজনীয় উপাদানের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি প্যানেলকে শক্তিশালী যান্ত্রিক সহায়তা প্রদান করে। ফলে সোলার প্যানেলগুলো হালকা এবং কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সোলার এনার্জি মেটেরিয়ালস অ্যান্ড সোলার সেলস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজির এনার্জি অ্যান্ড ন্যানো টেকনোলজি গ্রুপের বিজ্ঞানীরা মূলত পাতলা কম্পোজিট স্তরের মধ্যে একটি অ্যালুমিনিয়াম মৌচাক কোর যুক্ত করে হালকা ওজনের মডিউল তৈরি করেছেন। নতুন প্যানেলগুলোর ওজন প্রতি বর্গমিটারে মাত্র ৬ দশমিক ২ কেজি, যা সাধারণ ফটোভোলটাইক মডিউলের তুলনায় প্রায় ৪৮ শতাংশ কম। ওজনে কম হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক শক্তি বজায় রাখতে পারে।

নতুন এই প্যানেলের স্থায়িত্ব যাচাই করতে স্যাঁতসেঁতে তাপের সংস্পর্শ, আর্দ্রতা জমাট বাঁধার চক্র, অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব, যান্ত্রিক লোড টেস্টিং এবং সম্ভাব্য-প্ররোচিত অবক্ষয় পরীক্ষা করা হয়েছে। সব কটি পরীক্ষাতেই মৌচাকভিত্তিক এই মডিউলগুলো সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে প্যানেলের ওজন কম হলেও নির্ভরযোগ্যতা বা বৈদ্যুতিক কার্যকারিতা মোটেও কমে না।

কাঠামোগত স্থায়িত্ব উন্নত করার পাশাপাশি এই হালকা প্যানেলগুলো পরিবহন, স্থাপন এবং ব্যবহার করা সহজ। বিশেষ করে ছাদ এবং ভবনের ওপর যেখানে ওজনের একটি বড় সীমাবদ্ধতা থাকে, সেখানে এগুলো দারুণ কার্যকর হবে। এটি উৎপাদনপ্রক্রিয়া চলাকালীন প্রয়োজনীয় কাঁচামালের পরিমাণও কমায়। ফলে উৎপাদন খরচ কমে যেতে পারে। যেসব কাঠামো সাধারণ ভারী কাচের প্যানেলের ওজন সহ্য করতে পারে না, সেখানে ফটোভোলটাইক সিস্টেম স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া