দাম বেড়েছে চার থেকে পাঁচ গুণ দাম।প্রতিদিন ৫-৭ কোটি টাকার বেচাকেনাব্যানানা ম্যাংগো জাতের আম প্রতি মণ ১০ থেকে ১৫ হাজারআম্রপালি প্রতি মণ ২০ থেকে ২৫ হাজারদেশের সর্ববৃহৎ আমের মোকাম নওগাঁর সাপাহার আমের বাজারে মৌসুম প্রায় শেষ। অধিকাংশ বাগান ইতোমধ্যে আমশূন্য। কিন্তু ঠিক এই সময়েই নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাজার। সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক জাতের আমের দাম ভরা মৌসুমের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চমক দেখাচ্ছে আম্রপালি ও ব্যানানা ম্যাংগো জাতের আম। ভরা মৌসুমে যে ব্যানানা ম্যাংগো জাতের আম প্রতি মণ ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এখন সেই আমের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা এছাড়া ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দরের আম্রপালি প্রতি মণ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ।সরেজমিনে শনিবার (১ আগস্ট) সাপাহার আমের হাট ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের চাষিরা ব্যাটারিচালিত ভ্যান, শ্যালোচালিত যান ও পিকআপে ক্যারেটভর্তি আম নিয়ে বাজারে আসছেন। যদিও ভরা মৌসুমের তুলনায় আমের পরিমাণ অনেক কম, তবু বাজারে ক্রেতার ভিড় কমেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকাররা ভালো মানের আম সংগ্রহে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বর্তমানে এই বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে।গত ১৫ জুন, অর্থাৎ ভরা মৌসুমে সাপাহার আমের বাজারে প্রতি মণ হিমসাগর বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, ল্যাংড়া ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, নাক ফজলি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, হাড়িভাঙ্গা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ব্যানানা ম্যাংগো ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং আম্রপালি ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে।অথচ এখন বাজারে হিমসাগর, ল্যাংড়া, নাক ফজলি ও হাড়িভাঙ্গা প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমানে অল্প পরিমাণে আম্রপালি, নাভি (ব্যানানা ম্যাংগো), বারি-৪, আশ্বিনা, গৌড়মতি ও কাটিমন বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে আম্রপালি প্রতি মণ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, ব্যানানা ম্যাংগো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, বারি-৪ ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা, কাটিমন ও গৌড়মতি ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং আশ্বিনা ২ থেকে ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।সাপাহারের আম ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবছরই মৌসুমের শেষ দিকে বাগানে আম কমে যায়। সরবরাহ কমে গেলেও বাজারে ভালো মানের আমের চাহিদা থেকে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ে। তবে এ বছর তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে অধিকাংশ জাতের আম আগেভাগেই পেকে যাওয়ায় ভরা মৌসুমে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছিল। তখন দাম ছিল সবচেয়ে কম। এখন সেই অতিরিক্ত সরবরাহ না থাকায় বাজার পুরোপুরি বিক্রেতানির্ভর হয়ে উঠেছে।সাপাহারের আমচাষি মানিক বলেন,“মৌসুমের শুরুতে দাম এত কম ছিল যে অনেকেই উৎপাদন খরচ তুলতে পারেননি। এখন শেষ দিকে এসে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তখন যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন।”কুচিন্দা গ্রামের চাষি রুবেল হোসেন বলেন, “এখন বাজারে আম কম। তাই ভালো মানের নাভি ও বারি-৪ আমের চাহিদা অনেক বেশি। যারা শেষ সময় পর্যন্ত আম ধরে রাখতে পেরেছেন, তারা লাভবান হচ্ছেন।”ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে এখন প্রতিদিন আমের পরিমাণ কমছে। ফলে ভালো মানের আম পেলেই পাইকারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং দরও বাড়ছে।সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত বলেন, “এখন আমের মৌসুম শেষভাগে। বর্তমানে মূলত নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেই আম পাওয়া যাচ্ছে। সাপাহারে অল্প কিছু আম্রপালি থাকলেও প্রতি মণ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। যতদিন যাবে সরবরাহ কমবে, ততই দাম বাড়বে।”সাপাহারের বরেন্দ্র এগ্রো লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা বলেন, “নওগাঁর লেট ভ্যারাইটিজ আম এখন দেশের বাজারে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু শুধু কাঁচা ফল বিক্রির ওপর নির্ভর করলে চাষিরা কখনো স্থায়ীভাবে লাভবান হতে পারবেন না। প্রয়োজন আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, আম প্রক্রিয়াজাত শিল্প, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকিং ব্যবস্থা এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ। মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে যে দাম পড়ে যায়, সেই চাপ কমাতে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিকল্প নেই। সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা সমন্বিতভাবে কাজ করলে নওগাঁর আম বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে এবং চাষিরাও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতভাবে পাবেন।”সোহেল রানা আরও বলেন, “বিশেষ করে ব্যানানা ম্যাঙ্গো, বারি-৪, আম্রপালি ও অন্যান্য লেট ভ্যারাইটিজ আমের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। সঠিক বিপণন কৌশল গ্রহণ করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই অঞ্চলের আম অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।”নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, “নওগাঁ বরেন্দ্র অঞ্চলভুক্ত হওয়ায় এখানকার মাটি ও আবহাওয়ার কারণে আমের স্বাদ ও গুণগত মান আলাদা। মৌসুমের শেষ সময়ে এসে চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছেন। লেট ভ্যারাইটিজ আমের চাষ আরও সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা মৌসুমের শেষেও লাভজনক বাজার ধরতে পারেন।”কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টন। আমকে ঘিরে এ বছর জেলার অর্থনীতিতে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ।সংশ্লিষ্টদের মতে, নওগাঁর আম এখন দেশজুড়ে ব্র্যান্ডে পরিণত হলেও এখনও বড় আকারের কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাত শিল্প, আন্তর্জাতিক মানের গ্রেডিং ও প্যাকেজিং এবং সরাসরি রপ্তানি অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। ফলে মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় অনেক আম কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন চাষিরা।বিশেষজ্ঞদের মতে, আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো, রপ্তানি সহজ করা এবং লেট ভ্যারাইটিজ আমের চাষ আরও সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের সর্ববৃহৎ এই আমের বাজার শুধু মৌসুমেই নয়, বছরের দীর্ঘ সময়জুড়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।