পাহাড়ের বুকজুড়ে ভেসে থাকা মেঘ ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা ছিল নওগাঁর জিনিয়া ফেরদৌসীর। সে স্বপ্ন নিয়েই ৬ জুলাই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নিয়ে তিনি সাজেক ভ্যালির রুইলুইপাড়ায় বেড়াতে আসেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এখন কয়েক শ পর্যটকের সঙ্গে তাঁরাও আটকে পড়েছেন।
গতকাল বুধবার সকালে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সাজেক ছেড়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল জিনিয়ার। কিন্তু খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে সাজেকের বিভিন্ন কটেজ ও রিসোর্টে প্রায় ৬০০ পর্যটক আটকে পড়েছেন।
পাহাড়ি ঢলে সড়ক প্লাবিত, সাজেকে আটকা পড়েছেন সাড়ে চার শ পর্যটকনওগাঁ থেকে আসা পর্যটক জিয়াউল রহমান বলেন, ‘ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীসহ পুরো পরিবার নিয়ে একটা ট্যুরে এলাম। কিন্তু এসে এভাবে আটকে যাব, ভাবিনি; খুব টেনশন হচ্ছে। মাইকিং করে বলা হচ্ছে, তাঁরা রুমভাড়া নেবেন না। কিন্তু শুধু তো থাকার জায়গা হলেই হয় না; পরিবারের এতগুলো মানুষের খাওয়াদাওয়া ও মানসিক অবস্থার ব্যাপার আছে।’
জিয়াউল রহমানের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মেয়ে জিনিয়া ফেরদৌসী। জানতে চাইলে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘সাজেকে যে রূপটা দেখতে এসেছিলাম, তার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে শুধু মেঘ আর বৃষ্টি। সারা দিন রিসোর্টের ভেতর বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই। খাগড়াছড়ি আর সাজেকের সংযোগকারী রাস্তাগুলো নাকি তলিয়ে গেছে। আমরা কখন ফিরতে পারব, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।’

চাঁদপুর থেকে আসা তিন বন্ধু রাফি, রনি ও ফজলে রাব্বিও একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন। সীমিত বাজেট নিয়ে দুই দিনের জন্য সাজেকে এলেও টানা বৃষ্টিতে তাঁদের অবস্থান দীর্ঘ হয়েছে, পড়েছেন দুশ্চিন্তায়ও।
ফজলে রাব্বি বলেন, ‘দুই দিনের বাজেট নিয়ে এসেছিলাম, আজ তিন দিন হয়ে গেল। পকেটের টাকা শেষের দিকে। খাগড়াছড়ি থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে একটা মাহিন্দ্রা ভাড়া করে এনেছিলাম। এখন তো রাস্তা বন্ধ, গাড়ি চলার উপায় নেই। ড্রাইভার এখানে আটকে থাকায় প্রতিদিনের থাকা ও খাওয়ার খরচ দাবি করছেন। আমরা টাকার অভাবে নিজেরাই ঠিকমতো খেতে পারছি না।’
কয়েক দিন ধরে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল নেমেছে। গতকাল থেকে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়কের মাচালং, বাঘাইহাটসহ কয়েকটি অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। আজ বৃহস্পতিবারও সড়কের বিভিন্ন স্থানে কোমরসমান পানি থাকায় যান চলাচল বন্ধ আছে। কোথাও কোথাও সড়ক নদীর রূপ নিয়েছে, নৌকায় চলাচল করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
চট্টগ্রামে পানিবন্দী আট মাসের শিশুকে পাতিলে করে উদ্ধার, ফেসবুকে ভিডিওদুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে নতুন পর্যটকদের সাজেকে ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে আটকে পড়া পর্যটকেরা নিষেধাজ্ঞার আগেই সেখানে পৌঁছেছিলেন।
সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ প্রথম আলোকে বলেন, পানির কারণে আজ সকালে কোনো পর্যটকবাহী গাড়ি সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে ছেড়ে যেতে পারেনি। বর্তমানে প্রায় ৬০০ পর্যটক সাজেকে আটকা পড়ে আছেন।
সুপর্ণ দেব বলেন, ‘আমরা পর্যটকদের সাজেক ভ্যালিতে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছি। প্রতিনিয়ত প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। যদি বিকেলের মধ্যে সড়কের পানির স্তর নেমে যায় এবং যাতায়াতের ন্যূনতম পরিবেশ তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিশেষ স্কর্টের মাধ্যমে পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে আনা হতে পারে।’
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। পানি কমে গেলে পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে সাঙ্গু নদ, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ির পাঁচ উপজেলায় বেড়েছে পানি







