একটি ছবিরও ভাগ্য থাকে। কোনো কোনো ছবি শুধু একটি মুহূর্তকে বন্দি করে, আবার কোনো কোনো ছবি সময়ের অনেক আগে লিখে ফেলে ভবিষ্যতের গল্প।

প্রায় বিশ বছর আগে ক্যাম্প ন্যুর একটি ছোট্ট ড্রেসিংরুমে তোলা একটি ছবি আজ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রতীকগুলোর একটি। সেখানে ১৯ বছর বয়সী এক লাজুক তরুণ দুই হাতে ধরে আছেন তিন মাস বয়সী এক শিশুকে। ছোট্ট একটি বাথটাবে শিশুটিকে গোসল করিয়ে দিচ্ছেন তিনি। তখন কেউ জানত না, সেই তরুণ একদিন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হবেন। আর সেই শিশুটি হয়ে উঠবে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ ফুটবলার।

তাদের নাম লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামাল রবিবার, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেন যখন মুখোমুখি হবে, তখন প্রথমবারের মতো একই মাঠে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াবেন তারা। কিন্তু এই দুই প্রজন্মের দুই তারকার গল্প শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। এমন এক সময়ে, যখন ইয়ামাল ঠিকমতো চোখ মেলতেও শেখেনি।

এই গল্পের শুরু ২০০৬ সালে। কাতালান দৈনিক ‘স্পোর্ট’ এবং বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন তখন ইউনিসেফের জন্য অর্থ সংগ্রহে একটি বিশেষ ক্যালেন্ডার তৈরির উদ্যোগ নেয়। পরিকল্পনা ছিল সহজ। বার্সেলোনার তারকা ফুটবলারদের সঙ্গে শিশুদের ছবি তুলে সেই ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা হবে।

তখন স্পোর্ট-এর মার্কেটিং বিভাগে কাজ করতেন ওরিওল ক্যানালস। অনেক বছর পর ফিরে তাকিয়ে তিনি বলেন, প্রথম ক্যালেন্ডারের অভিজ্ঞতা ছিল এক কথায় উন্মাদনা। সব অনুমোদন পাওয়ার পর হাতে ছিল মাত্র চার দিন। ঘুমানোর সময় পর্যন্ত মেলেনি। পরিচিতজনদের সন্তানদের নিয়ে দ্রুত ফটোশুট শেষ করতে হয়েছিল। এরপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কাতালোনিয়ার নানা সম্প্রদায়ের শিশুদেরও এই উদ্যোগে যুক্ত করা হবে, যাতে ক্যালেন্ডারটি সমাজের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।

সেই সময় মাতারোর রোকাফোন্দা এলাকায় ইউনিসেফের একটি কমিউনিটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল ইয়ামালের পরিবার। একটি লটারিতে বিজয়ী হয়ে তারা সুযোগ পান সদ্যোজাত সন্তানকে বার্সেলোনার একজন ফুটবলারের সঙ্গে ছবি তোলার। সেই ফুটবলার হতে পারতেন রোনালদিনিয়ো। হতে পারতেন জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, কার্লেস পুয়োল, থিয়েরি অঁরি কিংবা ভিক্টর ভালদেসও।

কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য এক গল্প লিখে রেখেছিল। ২০০৭ সালের ১৩ জুলাই জন্ম নেওয়া লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে মা শেইলা ৩১ অক্টোবর পৌঁছেছিলেন ক্যাম্প ন্যুর ড্রেসিংরুমে। সেখানে অপেক্ষা করছিলেন ১৯ বছরের এক তরুণ, যার নাম তখনও ফুটবল দুনিয়ায় কিংবদন্তি হয়ে ওঠেনি।

সেই তরুণ লিওনেল মেসি। ফটোশুটের আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ত আজও সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত মনে রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এটা ছিল এক অলৌকিক ঘটনা।’

কিন্তু অলৌকিক সেই ছবিটি তুলতে কম বেগ পেতে হয়নি। ওরিওল ক্যানালসের ভাষায়, ‘মেসি তখন একদম কাঠের মতো শক্ত হয়ে ছিল। সম্ভবত জীবনে আগে কখনো কোনো শিশুকে কোলে নেয়নি।’ মনফোর্তেরও মনে আছে সেই দৃশ্য, তাঁর মতে, ‘মেসি তখন খুবই লাজুক আর অন্তর্মুখী। পুরো সেটআপ দেখে তার মুখে ভয় আর অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল।’

ছবিটিকে প্রাণবন্ত করে তুলতে শেষ পর্যন্ত নিজের মেয়ের খেলনার বাক্স থেকে একটি প্লাস্টিকের হাঁস এনে ব্যবহার করেন মনফোর্ত। ছোট্ট ইয়ামালের মুখে হাসি ফোটাতে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সহায়। এমনকি যে বাথটাবে শিশুটিকে গোসল করানো হয়েছিল এবং যে তোয়ালে দিয়ে মুছে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও আলোকচিত্রীর নিজের বাড়ি থেকে ধার করে আনা। শেষ পর্যন্ত ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয় এমন একটি মুহূর্ত, যা তখন ছিল শুধুই একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের ছবি। কেউ বুঝতেই পারেনি, সেটি একদিন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলোর একটি হয়ে উঠবে।

বছরের পর বছর সেটি পড়ে ছিল ইয়ামাল পরিবারের পুরোনো অ্যালবামে। ২০২৪ সালে হঠাৎ করেই ছবিটি নতুন জীবন পায়। ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর কয়েক দিন আগে ইয়ামালের বাবা মুনির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি প্রকাশ করেন। মুহূর্তের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। অনেকে বিশ্বাসই করতে পারেননি। কেউ বলেছিলেন, এটি নিশ্চয়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ছবি। কিন্তু না, ছবিটি ছিল একেবারেই বাস্তব।

ক্যানালস বিস্ময় লুকাতে পারেননি, ‘এটা জীবনের দেওয়া সবচেয়ে সুন্দর উপহারগুলোর একটি। যেন মাইকেল জর্ডান ছোট্ট লেব্রন জেমসকে গোসল করাচ্ছেন। ব্যাপারটা পুরোপুরি অবিশ্বাস্য।’

আর জোয়ান মনফোর্তের কাছে ছবিটি যেন সময়কে হার মানানো এক দলিল। তিনি বলেন, ‘এই ছবিটি আমার আত্মায় গেঁথে আছে। তখনও এটা অলৌকিক ছিল, আজও তাই। মনে হয়, ইতিহাস ঘটার আগেই যেন ইতিহাস লিখে ফেলা হয়েছিল। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, মেসি ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্রীড়াবিদ হবে, আর ইয়ামাল ১৬ বছর বয়সেই বিশ্বকে মুগ্ধ করবে, ১৭ বছরে ইউরো জিতবে, তারপর ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসির বিপক্ষে খেলতে নামবে।’

এরপর কিছুক্ষণ যেন নিজের কথাতেই হারিয়ে যান এই আলোকচিত্রী, ‘আমি কখনো ধর্মবিশ্বাসী ছিলাম না। কিন্তু এখন মনে হয়, আমাদের চেয়ে বড় কোনো শক্তি হয়তো সত্যিই আছে। কীভাবে সবকিছু এত নিখুঁতভাবে এক সুতোয় গাঁথা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। সবকিছুই যেন জাদুর মতো।’

রবিবার নিউইয়র্কের মঞ্চে যখন বিশ্বকাপের ফাইনালের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবেন মেসি আর ইয়ামাল, তখন কোটি কোটি মানুষ দেখবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে। কিন্তু একটি ছবি জানে, এই গল্পের শুরু আজ নয়। একদিন ১৯ বছরের এক লাজুক তরুণ নিজের অজান্তেই কোলে তুলে নিয়েছিলেন ভবিষ্যতের আরেক মহাতারকাকে। ফুটবলে অনেক কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। কিন্তু কিছু গল্প কাকতালীয় নয়। সেগুলো যেন সময়ের হাতে লেখা। মেসি আর ইয়ামালের সেই ছবিটিও ঠিক তেমনই। একটি ছবি, যা স্মৃতি নয়, ইতিহাস। একটি মুহূর্ত, যা ভবিষ্যৎকে আগেই দেখে ফেলেছিল।