‘সংবিধানের ৬৭ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের সংসদ সদস্য পদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে ঢাকা-০৮ আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে’—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে।
‘Monzurul Hasan’ নামের ফেসবুক থেকে জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠের আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে দাবি করা হয়, ‘অনেক দিন আগেই আমি বিষয়টি পোস্ট করেছিলাম। সংবিধান অনুযায়ী অটোমেটিক মির্জা আব্বাসের সংসদ সদস্য পদ বিলুপ্ত হলো আজ। সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।’ প্রচারিত ওই পোস্টে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার শর্তসমূহও উল্লেখ করা হয়।
গতকাল (১ সেপ্টেম্বর) শেয়ার করা পোস্টটিতে ৮০৮ রিয়েকশন, ৪০ কমেন্ট ও ১৮ শেয়ার রয়েছে। এ ছাড়া, আলোচিত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোর (১, ২, ৩ ) কমেন্ট পর্যালোচনা করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।
ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণে সংবিধানের ৬৭(১)-এর (ক) ও (খ) অনুচ্ছেদে বর্ণিত নিয়ম, মির্জা আব্বাস ও স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের ছবি এবং ৩০ আগস্টের তারিখ উল্লেখ থাকতে দেখা যায়। তবে ফটোকার্ডটির ‘প্রথম পৃষ্ঠা’ লেখা দেখে এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
অনুসন্ধানে কালের কণ্ঠের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে ‘ঢাকা-০৮ আসন শূন্য ঘোষণা’ কিংবা ‘মির্জা আব্বাসের সংসদ সদস্য পদ বিলুপ্ত’—এমন কোনো সংবাদ বা ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া, নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, অন্যান্য মূলধারার গণমাধ্যম কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রেও আলোচিত দাবির পক্ষে কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আলোচিত দাবির বিষয়ে অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৭(১) অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করা হয়। সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার বিষয়ে ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে কোনো সংসদ সদস্য তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করতে এবং শপথপত্র বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে অসমর্থ হলে তাঁর আসন শূন্য হবে। তবে নির্ধারিত ৯০ দিন শেষ হওয়ার আগে স্পিকার যথার্থ কারণে এই সময়সীমা বাড়াতে পারবেন।
প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনুসন্ধানে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন। ওই দিন ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের শপথ গ্রহণের বিষয়েও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একাধিক (১, ২ ) প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রচারিত এসব প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, মির্জা আব্বাস ১৭ ফেব্রুয়ারি সংবিধানের ৬৭(১) এর (ক) এবং (খ) অনুচ্ছেদে বর্ণিত নিয়ম মেনে শপথ শপথ নিয়েছিলেন।
অনুসন্ধানে ‘সংসদে মির্জা আব্বাসের অনুপস্থিতি নিয়ে জামায়াতের প্রশ্ন, যা জানালেন স্পিকার’ শিরোনামে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ২৩ জুন প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের শারীরিক অবস্থা এবং সংসদে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেন, মির্জা আব্বাস দেশের একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং সংসদের অভিজ্ঞ সদস্য। তাঁর সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা, শপথ গ্রহণসংক্রান্ত পরিস্থিতি এবং কবে তিনি সংসদের কার্যক্রমে যোগ দিতে পারবেন, সে বিষয়ে সংসদকে অবহিত করা প্রয়োজন।
জবাবে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, মির্জা আব্বাস চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন যে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে। যথাসময়ে সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি সংসদে উপস্থিত হবেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এর আগে ৩ জুন জাতীয় সংসদের স্পিকারকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) ও সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ শারীরিক অসুস্থতার কারণে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, তাঁর সুস্থ হতে আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং স্থায়ী কমিটির কোনো বৈঠকে অংশ নিতে পারবেন না। এ কারণে তাঁর অনুপস্থিতির সময়কে সাধারণ ছুটি হিসেবে গণ্য করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়।
এমন পরিস্থিতিতে তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়া বা তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করার দাবিটির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, গত ১১ মার্চ ইফতারের সময় হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মির্জা আব্বাস। শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ওই দিন গভীর রাতে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে আজ দেশে ফিরছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে রাত ৯টার দিকে মির্জা আব্বাসের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের আসন শূন্য ঘোষণার দাবিতে কালের কণ্ঠের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডটি ভুয়া।








