জগৎ–সংসারে কিসের হরষ? কিসের তবে এ বিষাদ-খেলা?
আশার কুহকে মজিয়া মানব, কাটায় কেবলই বেলা।

আরেকটি বিশ্বকাপ, আরেকটি বুকভাঙা আকুতি, আর সেই চেনা ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি। হেক্সা জয়ের সেই সোনালি স্বপ্ন, যা প্রতি চার বছর পরপর সাম্বা ছন্দে মেতে ওঠে, তা আবারও অধরাই রয়ে গেল।

ধু ধু মরুভূমির মরীচিকার মতো, যতবারই ফুটবলপ্রেমীরা মারাকানার সেই হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বাঁধে, ততবারই নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে বিদায়ের করুণ সুর বেজে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের সেই চিরচেনা দুঃখবাদের বিষাদগ্রস্ত সুর যেন আজ আছড়ে পড়েছে কোটি কোটি সেলেসাও ভক্তের হৃদয়ে।

নরওয়ে নেইমারদের জন্য চির দুঃখের নাম হয়ে থাকবে

মানুষ কীভাবে আশার ছলনায় মজে থাকে, আর শেষমেশ রুক্ষ বাস্তব এসে তাকে আঘাত করে! ব্রাজিলের এবারের বিশ্বকাপ যাত্রাও ঠিক যেন সেই দর্শনেরই এক মূর্ত প্রতীক। গ্রুপ পর্বের দাপট, মাঠের নান্দনিক পাস, আর গ্যালারিতে হলুদ-সবুজের যে জোয়ার উঠেছিল, তা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল এক ঝটকায়। মাঠের সবুজ ঘাসে যখন শেষ বাঁশিটি বাজল, তখন আর কোনো সাম্বা নাচ ছিল না; ছিল কেবল বুকভাঙা কান্না আর শূন্যতায় চেয়ে থাকা কিছু চোখ।

‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু, অনলে পুড়িয়া গেল...’
ব্রাজিল–ভক্তদের অবস্থাও আজ ঠিক তা–ই। ষষ্ঠ নক্ষত্রটি জার্সিতে জড়ানোর যে ঘর তারা বেঁধেছিল, মাঠের নির্মম বাস্তবতার অনলে তা পুড়ে খাক হয়ে গেল।

যেকোনো বড় পরাজয়ে নিয়তিকে মনে হয় এক কঠোর ও উদাসীন শক্তি। ব্রাজিলের বিদায়ও যেন সেই অলক্ষ্য নিয়তির এক অমোঘ বিধান। প্রতিভার কোনো কমতি ছিল না, পায়ে পায়ে জাদুর কমতি ছিল না; তবু শেষ রক্ষা হলো না। পেনাল্টির সেই স্নায়ুচাপ কিংবা শেষ মুহূর্তের রক্ষণভাগের এক মুহূর্তের অসতর্কতা; ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট ছিল একটি মহাকাব্যের অকালমৃত্যুর জন্য।

বিদায়, লুকা মদরিচ; বিদায়, দুঃখজয়ী রাজপুত্র
দুর্দান্ত হলান্ডে ব্রাজিলকে হারিয়েছে নরওয়ে

পেন্টা জয়ের পর কেটে গেছে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলেছে, রোনালদো-রোনালদিনহোর যুগ পেরিয়ে ভিনিসিয়ুস-রদ্রিগোদের আগমন ঘটেছে, কিন্তু নিয়তির সেই বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি সেলেসাওরা। মাঠের কোনায় বসে যখন দলের সেরা তারকাটি ডুকরে কেঁদে ওঠেন, তখন মনে হয় দুঃখ কেবল মানুষের মনে নয়, এই ফুটবল বিধাতার নিয়মেই মিশে আছে।

ব্রাজিল ফুটবল মানে শুধু একটা দল নয়, এটি একটি আবেগ, একটি ধর্ম। আর তাই এই বিদায় কেবল একটি টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া নয়, এটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত। এই জগৎ–সংসারে আনন্দের মুহূর্তগুলো ক্ষণস্থায়ী, আর বিষাদটাই যেন চিরন্তন সত্য।

তবু, ফুটবলপ্রেমী মানুষের মন তো আশাবাদী। আজ রাতে যে অশ্রুধারা রিও ডি জেনিরো থেকে ঢাকা, সারা বিশ্বকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তা একদিন শুকিয়ে যাবে। এই গভীর বিষাদকে সঙ্গী করেই ব্রাজিল–ভক্তরা হয়তো আবারও বুক বাঁধবে।

আজ বিদায়ের সানাই বাজলেও চার বছর পর আবারও কোনো এক ভোরে তারা জেগে উঠবে সেই একই স্লোগান বুকে নিয়ে, মিশন হেক্সা! কিন্তু আপাতত, চারদিকে শুধু একটাই হাহাকার, বিদায় ব্রাজিল!

লেখক: কর্মকর্তা, ভূমি মন্ত্রণালয়