বিশ্বকাপের উত্তেজনা যখন মাঠ ছাড়িয়ে টেবিল টকে তুঙ্গে, ঠিক তখনই ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী হলো শতবর্ষের ইতিহাসের অন্যতম বড় এক বিতর্কের। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন ব্যালোগুনের লাল কার্ড ও পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘটনাটি এখন আর কেবল মাঠের ফুটবল বা রেফারি-ভিএআরের সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর পেছনে জড়িয়ে গেছে স্বয়ং মার্কিন হোয়াইট হাউস, ফিফা সভাপতির বিশেষ সম্পর্ক এবং পর্দার আড়ালের এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক ও আইনি নাটক।
মাঠের সেই বিতর্কিত লাল কার্ড ঘটনার সূত্রপাত রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে, যেখানে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মুখোমুখি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ম্যাচের একপর্যায়ে বসনিয়ার খেলোয়াড় তারিক মুহারেমোভিচকে ফাউল করার অপরাধে যুক্তরাষ্ট্রের তারকা স্ট্রাইকার ফোলারিন ব্যালোগুনকে লাল কার্ড দেখান রেফারি। ম্যাচটি যুক্তরাষ্ট্র ২-০ গোলে জিতলেও, লাল কার্ডের নিয়ম অনুযায়ী বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে হাইভোল্টেজ শেষ ১৬-এর ম্যাচে ব্যালোগুনের এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মাউরিসিও পোচেত্তিনো শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন, এটি কোনোভাবেই লাল কার্ড হওয়ার মতো ফাউল ছিল না। কিন্তু ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, লাল কার্ডের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক আপিলের সুযোগ থাকে না। ফলে ব্যালোগুনকে ছাড়াই বেলজিয়াম বধের ছক কষতে শুরু করেছিলেন।
পর্দার আড়ালে মার্কিন প্রশাসনের তৎপরতা ব্যালোগুন নিষিদ্ধ থাকবেন, এমনটা ধরে নিয়েই যখন মার্কিন দল অনুশীলন করছিল, তখন পর্দার আড়ালে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। এই আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হয় মার্কিন প্রশাসন ও প্রভাবশালী সব ব্যক্তিত্ব।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ফেডারেশন (ইউএস সকার) বাইরের বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী দল গঠন করে। এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক এবং ইউএস সকার ও কোচ পোচেত্তিনোর তহবিলের অন্যতম জোগানদাতা স্কট গুডউইন। হোয়াইট হাউসের তৈরি করা ‘বিশ্বকাপ টাস্কফোর্স’-এর নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি সার্বক্ষণিকভাবে আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় করছিলেন এবং ফিফার কাছ থেকে নিয়মিত আপডেট নিচ্ছিলেন। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্য দাবি করেন যে, এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অন্যায় করা হয়েছে।
ট্রাম্পের সেই ফোন কল পুরো বিশ্বকাপজুড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুব একটা সামনে দেখা না গেলেও, গত সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে তিনি সরাসরি দৃশ্যপটে আসেন। এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ট্রাম্প সরাসরি ফোন করেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে। ফোনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ব্যালোগুনের এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো।
ট্রাম্প এবং ইনফান্তিনোর এই ঘনিষ্ঠতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। গত ডিসেম্বরে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনো ব্যক্তিগত উদ্যোগে ট্রাম্পকে একটি ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ প্রদান করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফা একটি অফিসও খুলেছে, যার জন্য ট্রাম্প পরিবারকে নিয়মিত ভাড়া দিচ্ছে সংস্থাটি। এমনকি ট্রাম্পের পরামর্শেই লাস ভেগাস থেকে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠান সরিয়ে ওয়াশিংটন ডিসির কেনেডি সেন্টারে নেওয়া হয়েছিল। ফলে ট্রাম্পের এই ফোন কল ফিফা প্রশাসনের ওপর যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছিল, তা বলাই বাহুল্য।
ফিফার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত ও ট্রুথ সোশ্যালে উদযাপন আইনি ও রাজনৈতিক এই ত্রিমুখী চাপের মুখে রোববারে দ্য অ্যাথলেটিক এক বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়, ফিফার স্বাধীন শৃঙ্খলা কমিটি ব্যালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেহেতু লাল কার্ড সরাসরি বাতিল করার নিয়ম নেই, তাই ফিফা তাদের বিধির ফাঁকফোকর গলে শুধু ব্যালোগুনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, যাতে তিনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে পারেন।
এই সিদ্ধান্ত আসার পরপরই ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখেন, যা সঠিক ছিল তা করার জন্য এবং একটি বড় অন্যায়ের সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ।
দুই শিবিরের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের এই খবরটি এতটাই অবিশ্বাস্য ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্ডার ক্রিস রিচার্ডস ভেবেছিলেন এটি হয়তো এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কোনো ফেক নিউজ। দলের প্রধান তারকা ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ ব্যালোগুনকে ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তবে মুদ্রার ওপিঠে থাকা বেলজিয়াম শিবির এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।
রয়্যাল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ফিফার এই সিদ্ধান্তে পুরোপুরি স্তম্ভিত এবং এর বিরুদ্ধে আইনি পথ খুঁজছে। বেলজিয়ামের প্রধান কোচ রুডি গার্সিয়া তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, তিনি জানতেন না ফিফার কাছে ৫ জুলাই আর এপ্রিল ফুলস ডে একই ব্যাপার। তিনি মনে করেন, ফিফা এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ফুটবলের নৈতিকতা ও সততা নষ্ট করেছে।
যদিও মার্কিন দল এবং কোচ পোচেত্তিনো বিষয়টিকে আইনি ও কারিগরি যুক্তির জয় হিসেবে দেখছেন, তবে ফুটবল বিশ্বের বড় একটা অংশ একে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের এক কালো অধ্যায় হিসেবেই বিবেচনা করছে। ফিফার সংবিধানে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার কথা বলা থাকলেও, ট্রাম্পের ফোন এবং ফিফার এই রহস্যজনক ইউ-টার্ন ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল এক বিশাল বিতর্ক হিসেবেই থেকে যাবে।








