বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রতিবছর মূল্যায়ন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৪৫টি দেশের সামরিক শক্তির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেনাসদস্যের সংখ্যা ছাড়াও প্রতিরক্ষা বাজেট, প্রযুক্তি, অস্ত্রভান্ডার, লজিস্টিকস, ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামরিক অবকাঠামোসহ ৬০টিরও বেশি সূচকের ভিত্তিতে এই র‌্যাঙ্কিং নির্ধারণ করা হয়েছে।

এবারের তালিকায় উত্তর আফ্রিকার দেশ মিশর রয়েছে বিশ্বের ১৯তম শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা অবস্থান করেছে ৩২তম স্থানে। ফলে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতায় মিশরই এগিয়ে রয়েছে।

পাওয়ার ইনডেক্সে স্পষ্ট ব্যবধান

গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার প্রতিটি দেশের সামরিক সক্ষমতা মূল্যায়নে পাওয়ার ইনডেক্স ব্যবহার করে। এই সূচকে স্কোর যত শূন্যের কাছাকাছি থাকে, সংশ্লিষ্ট দেশের সামরিক শক্তি তত বেশি বলে বিবেচিত হয়।

২০২৬ সালের প্রতিবেদনে মিশরের স্কোর ০.৩৬৫১, আর আর্জেন্টিনার স্কোর ০.৫৯৮৩। অর্থাৎ সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতায় মিশর উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে।

আরও পড়ুন>
হাজার বছরের রহস্যের দেশ মিশর, সেরা দর্শনীয় স্থান কোনগুলো?
ইতিহাসের পাতায় মিশর: ভাগ্য যাদের বারবার কাঁদায়

জনশক্তিতে মিশরের বড় সুবিধা

মিশরের মোট জনসংখ্যা ১১ কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ২৪৮ জন, যা বিশ্বে ১৫তম। এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য এবং ৩ কোটি ৮২ লাখের বেশি মানুষ সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ। দেশটির সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য জনশক্তি প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ, আর যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত জনশক্তি প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ।

সেনাসংখ্যায় বিশাল ব্যবধান

মিশরের মোট সামরিক সদস্য (আনুমানিক) প্রায় ১২ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে সক্রিয় সদস্য ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০। দেশটির স্থলবাহিনীতে ৬ লাখ ৮৫ হাজার, বিমান বাহিনীতে ৫০ হাজার এবং নৌবাহিনীতে ৫০ হাজার সদস্য রয়েছে।

এ ছাড়া দেশটির রিজার্ভ বাহিনীতে প্রায় ৪ লাখ ৭৯ হাজার এবং আধাসামরিক বাহিনীতে ৩ লাখ সদস্য রয়েছে। আধাসামরিক বাহিনীর আকারের দিক থেকে মিশর বিশ্বের সপ্তম স্থানে।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার মোট সামরিক সদস্য মাত্র ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৭০ জন। এর মধ্যে সক্রিয় সদস্য ১ লাখ ৮ হাজার, স্থলবাহিনীতেও প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার, বিমান বাহিনীতে ১৪ হাজার এবং নৌবাহিনীতে ১৮ হাজার ৩৭০ জন সদস্য রয়েছে।

রিজার্ভ বাহিনীতে সদস্য রয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৭০ জন এবং আধাসামরিক বাহিনীতে প্রায় ২০ হাজার সদস্য।

নতুন সেনা যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও এগিয়ে মিশর

প্রতি বছর মিশরে প্রায় ১৬ লাখ ৬৮ হাজার তরুণ সামরিক বয়সে পৌঁছায়। সম্ভাব্য বার্ষিক মোবিলাইজেশন সক্ষমতা প্রায় ১৬ লাখ ৪৮ হাজার।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় বছরে সামরিক বয়সে পৌঁছায় প্রায় ৭ লাখ ৫ হাজার তরুণ। ফলে দীর্ঘমেয়াদে নতুন জনবল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও মিশরের অবস্থান শক্তিশালী।

কী বলছেন বিশ্লেষকরা?

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সেনাসংখ্যা, রিজার্ভ বাহিনী, আধাসামরিক সক্ষমতা, জনশক্তি এবং সামগ্রিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর দিক থেকে মিশর বর্তমানে আর্জেন্টিনার তুলনায় অনেক এগিয়ে।

তবে গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার বলছে, কোনো দেশের সামরিক শক্তি শুধু সেনাসদস্য বা অস্ত্রের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা বাজেট, লজিস্টিকস, শিল্পভিত্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং যুদ্ধ পরিচালনার সামগ্রিক সক্ষমতাও এই মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সেই বিবেচনায় ২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচক অনুযায়ী, সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতায় মিশর আর্জেন্টিনার তুলনায় স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন>
হাজার বছরের রহস্যের দেশ মিশর, সেরা দর্শনীয় স্থান কোনগুলো?
ইতিহাসের পাতায় মিশর: ভাগ্য যাদের বারবার কাঁদায়

ভৌগলিক অবস্থান ও ইতিহাস

উত্তর আফ্রিকার দেশ মিশর বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার জন্মভূমি। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে নীল নদের তীরে গড়ে ওঠে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা, যা মানব ইতিহাসে বিজ্ঞান, স্থাপত্য, কৃষি ও প্রশাসনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফেরাউনদের শাসনামলে নির্মিত গিজার পিরামিড, স্ফিংক্স, লুক্সর ও কার্নাকের মতো স্থাপত্য আজও বিশ্বের বিস্ময়। মিশরীয়রা হায়ারোগ্লিফিক লিপি, উন্নত সেচব্যবস্থা এবং মমি সংরক্ষণের অনন্য পদ্ধতির জন্যও পরিচিত। সমৃদ্ধ ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের কারণে মিশরকে বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রতি বছর বিশ্বের লাখো পর্যটক দেশটির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেখতে ভিড় জমান।

দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী দেশ আর্জেন্টিনা সমৃদ্ধ ইতিহাস ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। স্পেনের উপনিবেশ হিসেবে দীর্ঘ সময় থাকার পর ১৮১৬ সালের ৯ জুলাই দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করে। এরপর কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। দেশটির সংস্কৃতিতে ইউরোপীয় ও লাতিন আমেরিকান ঐতিহ্যের অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। বিশ্বখ্যাত ট্যাঙ্গো নৃত্য ও সঙ্গীত, ফুটবল, সাহিত্য এবং গরুর মাংসভিত্তিক খাদ্যসংস্কৃতি আর্জেন্টিনার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজধানী বুয়েনস আইরেসকে দেশের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে ইতিহাস, শিল্প ও আধুনিকতার অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।

এমএসএম