বাংলাদেশের একটি বিমা কোম্পানিতে এক দশকেরও বেশি সময় আগে টাকা রাখতে শুরু করেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশি শফিকুল ইসলাম। ধীরে ধীরে সেই বিমার অংক প্রায় ১০ লাখে পৌঁছালে তিনি সেগুলো তুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর হতে চলছে, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, টাকা আর তুলতে পারছেন না।
বিদেশ-বিভুঁইয়ে পরিবার-পরিজনহীন অবস্থায় উপার্জিত তার এই ঘামঝরা অর্থ বছরের পর বছর এভাবে আটকে থাকায় প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি। এখন তার মনে হয়, এই টাকা দিয়ে যদি সোনা কিংবা কতগুলো সঞ্চয়পত্র কিনে রাখতেন, তাহলে তা অন্তত তার হাতে থাকত।
শফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম এবং কাঠামোগত দুর্বলতা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি উদ্বেগ তৈরি করেছে যে, তাদের টাকা কোথায় নিরাপদ?
আরও পড়ুন
সোনা কেন কিনে রাখবেন?
এই প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়ের প্রশ্ন এলে সোনাসহ বেশ কয়েকটি খাত বারবার আলোচনায় আসে। কখনো মূল্যস্ফীতি, কখনো মুদ্রার অবমূল্যায়ন, আবার কখনো ব্যাংকিং আস্থার সংকট—বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন কারণে মানুষ এসব খাতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে এগুলো কতটা নিরাপদ, কেন বিনিয়োগকারীরা এগুলোর দিকে আগ্রহী হন এবং কোথায় ঝুঁকি, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই বিশ্লেষণ।
সোনা: অস্থির সময়ে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট সোনার দাম লাখের ঘরে পৌঁছায়। এরপর মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে আড়াই লাখে পৌঁছায়। এরপর সামান্য কমলেও সোনার দাম এখনো দুই লাখের ওপরেই রয়েছে।
বর্তমানে দেশের বাজারে ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনা ভ্যাটসহ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকার কিছু বেশি দামে। আর সনাতন পদ্ধতির এক ভরি সোনার গহনা বিক্রি হচ্ছে দেড় লাখ টাকায়।
বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, তিনি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোনার ব্যবসা শুরু করেন। তখন সোনার দাম ছিল ভরিপ্রতি ৪ হাজার ৮৫০ টাকা।
আরও পড়ুন
ভরি-ক্যারেট-হলমার্ক / সোনা কেনার আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি
তিনি বলেন, ‘আম্মার বিয়ের সময় ছিল ৮০ টাকা। এরপর এটা বাড়তে বাড়তে ১০ হাজার, ৫০ হাজার, এক লাখ হলো। এখন আড়াই লাখ। মানি ডিভ্যালুয়েশনের জন্য এটা অনেক বেড়েছে।’
বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সোনার দাম নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিশ্বে সাধারণত যুদ্ধ কিংবা অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হলে সোনার দামে এক ধরনের প্রভাব পড়ে। শাহীনের ভাষায়, ‘সোনা এমন একটি জিনিস, যা অপেক্ষা করে দুঃসংবাদের জন্য। বিশ্বে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলেই সোনার দাম বেড়ে যায়। যখন সুবাতাস দেখা যায়, তখন কিছুটা কমে।’
এসব কারণেই বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার এবং অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি সোনাও বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বা রিজার্ভ হিসেবে জমা থাকে। ঐতিহাসিকভাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ সোনা দিয়েই গঠিত হতো এবং অতীতে একটি দেশের মুদ্রার মানও সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত সোনার ভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করত।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের বৃহত্তম সোনার রিজার্ভ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট ৮ হাজার ১৩৩ টন (৮১ লাখ কিলোগ্রামের বেশি) সোনা আছে, যা তাদের মোট বিদেশি সম্পদের ৭৮ শতাংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১৪ দশমিক ৮ টন (১৪ হাজার ৮০০ কিলোগ্রাম প্রায়) সোনার রিজার্ভ রয়েছে।
সুতরাং, টাকার মান কমে গেলে বা ব্যাংক খাতে অনাস্থা এসে গেলে সাধারণ মানুষও সোনায় বিনিয়োগ বাড়ান। কারণ সোনার মূল্য সরকারের সিদ্ধান্ত বা কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। অর্থাৎ, কোনো দেশের সরকার বা ব্যাংক সংকটে পড়লেও সোনা নিজে একটি আলাদা সম্পদ হিসেবেই থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই, বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বিনিয়োগের জন্য সোনাকেই সবচেয়ে নিরাপদ মনে করছেন।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে গহনা কেনার প্রবণতাটাই সাধারণত বেশি। এ বিষয়ে দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, ‘সোনার গহনার মূল্য অবশ্যই আছে। কিন্তু পিওর গোল্ড আদিকাল থেকে বিনিয়োগের একটি অংশ। পিওর গোল্ড মানে ২৪ ক্যারেট। তাই, সোনায় বিনিয়োগের কথা চিন্তা করলে পিওর গোল্ডের কয়েন বা বার কেনা উচিত।’
আরও পড়ুন
ধারণার চেয়েও কমে যেতে পারে সোনার দাম, বলছে পূর্বাভাস
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের পুরান ঢাকার তাঁতি বাজারে পিওর গোল্ড কিনতে পাওয়া যায়। আর সাধারণত প্রবাসী বাঙালিরা ব্যাগেজ রুলের আওতায় সর্বোচ্চ দশ ভরি পর্যন্ত সোনার বার নিয়ে আসতে পারেন। তাদের কাছ থেকে কেনা যায়। এটা একটি ইনভেস্টমেন্ট।’
তবে সোনায় বিনিয়োগে কিছুটা সতর্কও থাকা প্রয়োজন। কারণ সোনার দাম কিছুটা হলেও ওঠানামা করে। সেইসঙ্গে, এটি কোনো সুদ বা নিয়মিত আয় দেয় না।
সঞ্চয়পত্র: রাষ্ট্রের নিশ্চয়তার ভরসা
বাংলাদেশের বেশিরভাগ ব্যাংকই এখন দুর্বল অবস্থায় আছে। তাই, বাংলাদেশে ব্যাংকে টাকা রাখতে অনেকে নিরাপদ বোধ করছে না বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তার মতে, সোনায় বিনিয়োগের জন্য অন্যতম নিরাপদ জায়গা এখন এবং সোনার পর হলো সঞ্চয়পত্রের অবস্থান। কারণ সঞ্চয়পত্র সরকারের কাছ থেকে আসে, তাই এটি নির্ভরযোগ্য।
কিন্তু সেখানেও সীমা দেওয়া রয়েছে। সবাই সঞ্চয়পত্র কিনলে সরকারকে সুদসহ সেগুলো ফেরত দিতে হবে। এই সংকটের বিষয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন ইঙ্গিত করেন। সেজন্যই বিগত সময়ে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কিছুটা পরিবর্তনের পথে হেঁটেছিল সরকার। এতে সীমিত আয়ের বিনিয়োগকারীরা বিপাকে পড়ে যান। পরে ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়।
মূলত, নিরাপদ সঞ্চয় এবং মুনাফার হার বেশি থাকায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের একটি প্রচলিত খাত হলো সঞ্চয়পত্র। সঞ্চয়পত্র ইস্যু করে থাকে বাংলাদেশ সরকার, তাই মেয়াদ শেষে মুনাফাসহ বিনিয়োগ করা টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। পাশাপাশি, এই খাতে নির্দিষ্ট হারে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর কমানোর সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন
সোনা-রুপার দামে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতন দেখা যাচ্ছে?
কোনো করদাতার করযোগ্য বার্ষিক আয় যদি হয় ১০ লাখ টাকা, এর মধ্যে তিনি আয়ের ২০ শতাংশ বা দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনলে তিনি তার প্রদেয় করের ওপর সর্বোচ্চ ছাড় পাবেন। যে বছর বিনিয়োগ করবেন শুধু ওই বছরেই তার ওপর কর রেয়াত সুবিধা নিতে পারবেন।
তবে তিনি যে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করবেন তার অর্থ মেয়াদ পূর্তির আগে উত্তোলন করা যাবে না। সহজ করে বললে, যদি কেউ পাঁচ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন, তাহলে সেটা মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভাঙানো যাবে না। ওই সময়ের আগে কেউ নগদায়ন করে ফেললে করদাতা যে টাকার কর রেয়াত সুবিধা নিয়েছিলেন, তা বাতিল হয়ে যাবে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন যত ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এতে সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে প্রায় ১২ শতাংশ মুনাফা মেলে। সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পেনশন সঞ্চয়পত্রেও প্রায় কাছাকাছি মুনাফা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে অবসরপ্রাপ্ত মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কাছে সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়। এটা কেনা যাবে সকল সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়, ডাকঘর এবং সঞ্চয় ব্যুরো কার্যালয়ে। অনেক ব্যাংক রয়েছে যারা সঞ্চয়পত্র করার সকল ঝামেলার কাজ ও সুদের টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশ ও ভারতে সোনার দামে পার্থক্য কতটা?
জমি ও আবাসন: দৃশ্যমান সম্পদের আকর্ষণ
দীর্ঘমেয়াদে জমির দাম সাধারণত কমে না, বরং বাড়তেই থাকে—এই বিশ্বাস বহুদিনের। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, জমি বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করতে পারে। কারণ বাংলাদেশে মানুষ বেশি, জায়গা কম। এটাতে সবসময়ই ঊর্ধ্বমুখী এর দাম। একটা দেশের অর্থনীতি খারাপ হলেও জমির দাম সাধারণত কখনো কমে না।
জমি কিংবা আবাসনে বিনিয়োগের একটি সামাজিক ও মানসিক দিকও আছে। অনেকের কাছে এটি শুধু বিনিয়োগ নয়, বরং নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক। অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় দৃশ্যমান সম্পদে বিনিয়োগ মানুষকে মানসিক স্বস্তি দেয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, জমি বা রিয়েল এস্টেটের বড় ঝুঁকি হলো তারল্যের অভাব। কারণ জরুরি প্রয়োজনে এগুলো দ্রুত বিক্রি করা কঠিন। আবার, বাজার স্থবির হলে দাম দীর্ঘদিন আটকে থাকতে পারে এবং শহরে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ফ্ল্যাট বা বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে সেগুলো বিক্রি বা ভাড়া দিতেও সমস্যা হতে পারে।
আরও পড়ুন
সোনার দামে রেকর্ড পতন, এই সুযোগ থাকবে কতদিন?
এছাড়া, জমি কেনার আগে ভবিষ্যতে দাম বাড়বে এরকম জায়গা যদি নির্বাচন করা যায়, তাহলে আরও লাভ। আর জমিতে কোনো ঝামেলা আছে কি না সেটি ভালো করে খবর নিয়ে দেখতে হবে। কোনো ভুয়া লোকের খপ্পরে পড়লেই বিপদ।
জমির মাটি উঁচু ভবন তৈরি করার মতো কি না, আশপাশে কোন স্থাপনার জন্য জমির দাম বাড়তে পারে কি না, জমির কাছে রাস্তা আছে কি না, ড্রেনেজ সিস্টেম তৈরি হয়েছে কি না, এলাকাটি ভবিষ্যতে উন্নত হবে কি না—এসব যাচাই করেই জমি কেনা উচিত।
ডিপিএস: ব্যাংকের ‘স্বাস্থ্য’ বুঝে সিদ্ধান্ত
ডিপোজিট পেনশন স্কিমে মানুষ নিজের টাকা সঞ্চয় করেন, যার বিনিময়ে সুদ পান। কিছু ব্যাংক সাত থেকে সাড়ে সাত শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দিয়ে থাকে। এতে ব্যক্তি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য, যেমন—তিন, পাঁচ বা দশ বছরের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ জমা রাখবেন। নানা ব্যাংকে মাসে ১০০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা দেওয়া যায়।
কোনো কোনো ব্যাংক প্রতি মাসে সুদ দিয়ে থাকে, আবার কোনো ব্যাংক তিন মাস বা ছয় মাস অন্তর সুদ দেয়। এছাড়া, এককালীন ডিপিএস রয়েছে, যার সুদ মেয়াদ শেষে পাওয়া যায়। সমস্যা হলো, ডিপিএসে সেভিংস অ্যাকাউন্টের মতো যখন-তখন টাকা তোলা যাবে না।
ফাহমিদা খাতুন বলছিলেন, ডিপিএস করা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যাংকের স্বাস্থ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন ব্যাংকে টাকাটা রাখা হচ্ছে, সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
১৩ বছরের রেকর্ড পতনের পরও কমেই চলেছে সোনার দাম
তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোতে মুনাফা অনেকসময় কম থাকে। কারণ সরকার নির্ভর হয়ে গেলে সরকারের ওপর চাপ পড়ে যায় তখন। সেজন্য সরকার ইন্টারেস্ট কমিয়ে দিতে চায়। তবে প্রাইভেট ব্যাংকে প্যাকেজ থাকে, সেগুলোর হেলথ দেখে বিনিয়োগ করতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যে কোনো ব্যাংকে টাকা রাখা উচিত নয়। কারণ দেখা গেল যে ব্যাংক টাকাটা নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে আর সময়মতো তা ফেরত দিতে পারছে না। তাই, এক্ষেত্রে ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি জরুরি।
সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও বিল: এখনো নিরাপদ
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের ট্রেজারি বিল, এগুলো নিরাপদ। সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদে ও সুদে সরকার ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এসব বন্ড নিলামে কেনা-বেচা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড রয়েছে। এসব বন্ডে সুদের হার চার থেকে প্রায় আট শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। প্রতি ছয় মাস অন্তর মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের কোনো সীমা নেই।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎস কর দিতে হয়। ট্রেজারি বন্ডে মুনাফা গ্রহণের সময় পাঁচ শতাংশ কর দিতে হয়। ট্রেজারি বন্ড কেনা-বেচারও সুযোগ রয়েছে। বিক্রির সময় লাভে বিক্রি করা যায়।
আরও পড়ুন
দামে ১৩ বছরের সবচেয়ে বড় পতন, সোনা কেনার এখনই কি সেরা সময়?
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরী বলেছিলেন, কোনো বিষয় না বুঝলে তাতে বিনিয়োগ না করাই ভালো। যেমন, ট্রেজারি বন্ড হয়তো সবার জন্য নয়। কারণ এটি নিলামের মাধ্যমে নিতে হয়, কেনার ঝামেলা আছে, এটি সবাই বুঝতে পারে না।
শেষ কথা: নিরাপদ বিনিয়োগ বলে কিছু নেই
অর্থনীতিবিদরা একবাক্যে বলেন, ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ একটি আপেক্ষিক ধারণা। যে খাত একজনের কাছে নিরাপদ, অন্যজনের জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সময়, লক্ষ্য, আয় ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা—সবকিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থার কারণে মানুষ বিকল্প খুঁজলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, আতঙ্কের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
যেমন, ফাহমিদা খাতুনের মতে, জীবন বীমা সরকারের, কিন্তু এটা ডেভেলপড না আমাদের দেশে অতটা। এখান থেকে রিটার্ন অতটা ভালো আসে না। হ্যাঁ, কোনো বীমা বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক এককালীন এক লাখ টাকা দিবে, বাকিটাও দিবে, কিন্তু অনেক আস্তে আস্তে।
তার মতে, বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল প্রোডাক্টে অত অপশন নাই। অনেক দেশে বন্ড মার্কেট, ক্যাপিটাল মার্কেট থাকে। আমাদের সেই ডাইভারসিফিকেশন নাই। শেয়ার বাজার স্ট্রং না, শেয়ার বাজার ইজ নট অ্যান অপশন। ভালো ইনভেস্টররাই এখানে আসে না।
অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরীও বলেন, শেয়ারবাজার বাংলাদেশে খুবই অস্বচ্ছ একটা জায়গা, বিভিন্ন গ্রুপ ইন্টারনাল ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে দাম ওঠা-নামায় কারসাজি করে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে গেলে এটা ভালো করে বুঝতে হয়। সঞ্চয়পত্রের মতো কিনে ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না। অতএব, এখানে বিনিয়োগে সাবধান হতে হবে। আমরা নানা সময়ে দেখেছি যারা শেয়ারবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা স্বল্প পুঁজির মানুষ।
এছাড়া, অনেক সুদের লোভ দেখায়, এমন অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলতেও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/








