আটলান্টা থেকে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সেটা যে পৃথিবীব্যাপী কিছুদিন চলবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় গতকাল রাতে মিসরকে ৩–২ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। এ ম্যাচে রেফারিং ও ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়ে চলছে পক্ষে–বিপক্ষে তর্ক–বিতর্ক।
রেফারিং বিশেষজ্ঞ ও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সাবেক অফিশিয়াল গ্রাহাম স্কট এ নিয়ে নিজের মতামত জানিয়েছেন ‘দ্য অ্যাথলেটিক’ সংবাদমাধ্যমে। তাঁর মতে, ৬২তম মিনিটে মিসরের ফরোয়ার্ড মোস্তাফা জিকোর করা গোলটি বাতিল করা ‘ভুল সিদ্ধান্ত।’
স্কট ব্যাখ্যা করেন, ‘মিসরের গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। জিকোর করা গোলের ঠিক আগের মুহূর্তে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ওপর আত্তিয়ার চ্যালেঞ্জটি ছিল খুবই স্বাভাবিক কনট্যাক্ট (শারীরিক লড়াই)। এটিকে ফাউল না ধরে ম্যাচ রেফারিদের স্বাভাবিক হিসেবেই নেওয়া উচিত ছিল।’
স্কট এরপর বলেন, ‘ঘটনাটি ঘটেছিল গোলপোস্ট থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে। ফলে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে রক্ষণ সামলানোর পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল আর্জেন্টিনার সামনে। তাই ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) রিভিউয়ের পর গোলটি বাতিল হওয়ায় মিসর দল যে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করবে, তা বলাই বাহুল্য।’
ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোল বাতিল করার মতো অপরাধ হয়নি বলে মনে করেন স্কট, ‘যদি ঘটনায় তাকাই, তবে দেখা যাবে খেলোয়াড়দের মধ্যে সামান্য শরীরী লড়াই হয়েছিল—পায়ের ওপর পা রাখার পাশাপাশি জার্সি সামান্য টেনে ধরার ঘটনাও ঘটেছিল। তবে সেটি এমন কোনো বড় অপরাধ ছিল না, যার জন্য ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোলটি বাতিল করতে হবে।’

রেফারির ভুল সংশোধনে ভিএআর বিস্ময়করকারে সীমালঙ্ঘন করেছে বলেও মনে করেন ২০২৪–২৫ মৌসুম শেষে অবসর নেওয়া সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি স্কট। তাঁর মতে, ‘প্রতিটি গোলের ঠিক আগে আক্রমণের পর্যায়গুলো খতিয়ে দেখে ভিএআর। এই গোলের ক্ষেত্রেও তারা বলের দখল হারানোর মুহূর্ত পর্যন্ত পেছনে ফিরে তাকিয়েছে। গোল বাতিল করতে হলে সেখানে স্পষ্ট ফাউল থাকতে হয়, যা এখানে একেবারেই ছিল না। অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়—ফাউলের ঘটনা এবং গোলের মধ্যকার দূরত্ব ও সময় যত বেশি হবে, অভিযুক্ত ফাউলটি ততটাই গুরুতর হতে হবে।’
স্কট এরপর বলেন, ‘অথচ এখানে উল্লেখ করার মতো কোনো ফাউলই হয়নি। ভিএআর হস্তক্ষেপ করার মতো ন্যূনতম কোনো পরিস্থিতিও এটি ছিল না। একই যুক্তিতে, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মোহাম্মদ সালাহকে ফাউলের অভিযোগে মিসরের পেনাল্টির দাবিটি নাকচ করে দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন রেফারি। সালাহর বুটে সামান্য আঘাত লেগেছিল ঠিকই, তবে সেটা তাঁকে ফেলে দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল না। এটি কোনোভাবেই ফাউল ছিল না।’
ফক্স স্পোর্টসের ফুটবল নিয়ম বিশ্লেষক ও সাবেক ফিফা রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গ রেফারি এবং ভিএআর রিভিউ—উভয় সিদ্ধান্তের সঙ্গেই দ্বিমত পোষণ করেন। ম্যাচ শেষে ফক্স স্পোর্টসকে ক্ল্যাটেনবার্গ বলেন, ‘আমি মনে করি না যে এটি ফাউল ছিল এবং গোলটি বাতিল করতে ভিএআরের এভাবে হস্তক্ষেপ করা উচিত হয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এটি এমন কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না যেখানে ভিএআরের নাক গলানোর প্রয়োজন পড়ে।’
২০১৬ ইউরো ও চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে রেফারির দায়িত্ব পালন করা ক্ল্যাটেনবার্গ চলতি বিশ্বকাপে রেফারিদের ধারাবাহিকতার অভাবের দিকে আঙুল তোলেন। তাঁর দাবি, আগের ম্যাচগুলোতে প্রায় একই ধরনের ঘটনায় ভিএআরের এমন চুলচেরা বিশ্লেষণ দেখা যায়নি।

ক্ল্যাটেনবার্গ বলেন, ‘আমার মূল্যায়ন খুবই সহজ; এই টুর্নামেন্টে রেফারিরা যেভাবে ম্যাচ পরিচালনা করছেন, এই চ্যালেঞ্জ বা ফাউলটি তার সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না। তাঁরা ম্যাচে খানিকটা শারীরিক লড়াইয়ের জায়গা রেখেছেন। তাই এটা যে ফাউল ছিল না, সেই যুক্তি দেওয়ার জায়গাটা থাকে। মাঠের রেফারি যখন সিদ্ধান্ত দিয়েই দিয়েছেন, তখন ভিএআরের মাথা ঘামানোর কোনো সুযোগই নেই। ফাউল ছিল কি না, তা সম্পূর্ণ মাঠের রেফারির তাৎক্ষণিক বিবেচনার বিষয়। এটি মোটেও স্পষ্ট ফাউল ছিল না।’
ক্ল্যাটেনবার্গ আরও বলেন, ‘ভিএআর একটু বেশিই চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে এবং মিসরের গোলটি বাতিল করতে তারা যেন ম্যাচের মধ্যে খুঁত খুঁজেছে।’
আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ক্ল্যাটেনবার্গ বলেন, ‘আমরা যদি আর্জেন্টিনার দিকে তাকাই, কিছু সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই তাদের পক্ষে গেছে। আর এই ঘটনাটি তো অবশ্যই পক্ষে গেছে কারণ গোলটি বাতিল করা হয়। অবশ্যই বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ এটিকে ভিএআরের অন্যায্য হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখবে।’
ম্যাচ চলাকালীন ধারাভাষ্যকারেরা মন্তব্য করেন, সিদ্ধান্তটি ভিএআরের এখতিয়ারের বাইরে ছিল। তবে ফুটবলের আইন–প্রণয়ন প্রতিষ্ঠান আইএফএবির (ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড) নিয়মনীতি অনুযায়ী এই সিদ্ধান্তকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে।
আইএফএবির নিয়ম অনুযায়ী, একটি ঘটনার রিভিউ করা যাবে কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘ঘটনার আগের ও পরের খেলার সময়কালটি ফুটবলীয় আইন এবং ভিএআর প্রটোকল দ্বারা নির্ধারিত হবে।’
নিয়মে আরও বলা হয়েছে, ‘গোল হওয়ার ঠিক আগের আক্রমণাত্মক মুহূর্তে কোনো দলের আক্রমণকারী খেলোয়াড় যদি ফাউল বা নিয়মভঙ্গ (হ্যান্ডবল, ফাউল, অফসাইড ইত্যাদি) করেন, তবে তা রিভিউ করার অনুমতি দেওয়া হবে।’
EGYPT'S GOAL IS DISALLOWED! THE VAR REVIEW SPOTS A FOUL AND THE DECISION IS OVERTURNED!!! ❌ pic.twitter.com/MJplsjtzRB
— LIZZY EMPIRE ✨⚽ (@tobilobaagness) July 7, 2026
‘নিয়ম মেনেই করা হয়েছে’
ফক্স স্পোর্টসের ফুটবল রেফারিং বিশেষজ্ঞ ডক্টর জো মাচনিকের ধারণা ভিন্ন। তাঁর মতে, যেহেতু ঘটনাটি ফাউল ছিল, তাই গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্তটিই সঠিক।
ম্যাচ শেষে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ নাও’ অনুষ্ঠানে মাচনিক সিদ্ধান্তটি নিয়ে ব্যাখ্যা দেন। তাঁর ভাষায়, ‘এটি অনেক আগে থেকেই ভিএআর প্রটোকল বা নিয়মের অংশ। প্রযুক্তিটি চালুর একদম শুরুর দিকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কোনো ফাউলের সূত্র ধরে গোল হলে, সেই গোল কোনোভাবেই বৈধতা পাবে না। তবে নিয়মে ফাউল ও গোলের মধ্যকার কোনো নির্দিষ্ট দূরত্ব ৫ সেকেন্ড আগে বা ৭৫ গজ দূরে হতে হবে—এমন কোনো সময়সীমার কথা বলা হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ দল বলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে না পাচ্ছে বা নতুন কোনো মুভ তৈরি করতে না পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ধরে নেওয়া হবে ওই ফাউলের মাধ্যমেই বলের দখল নেওয়া হয়েছিল এবং সেই আক্রমণ থেকেই গোলটি এসেছে। এটি পুরোপুরি নিয়ম মেনেই করা হয়েছে, আর ঠিক এ কারণেই গোলটি বাতিল করা হয়।’
আর্জেন্টিনা ম্যাচের রেফারিং তদন্তের দাবি মিসরের







