মিশরের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে পিরামিড, ফারাও, ক্লিওপেট্রা, মমি, মরুভূমি আর ধন-সম্পদের প্রাচুর্য। বিশেষ করে প্রাচীন মিশর নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। ফারাওদের জীবন, মমি সমাধি যেমন আজও মানুষকে ভাবায় তেমনি পিরামিডের রহস্য ঘুম কেড়ে নেয় তাবড় তাবড় গবেষকদের।
মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার পাথরের পাহাড়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতির সৃষ্টি, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় এটি মানুষের হাতে গড়া এক বিস্ময়। হাজার হাজার বছর ধরে সূর্য, ঝড়, বালুঝড় আর সময়ের নির্মম আঘাত আর রহস্য বুকে নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মিশরের পিরামিড। পৃথিবীর প্রাচীন সাত আশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র এখনো টিকে থাকা এই স্থাপত্য শুধু একটি সমাধি নয়, এটি মানবসভ্যতার অন্যতম বড় রহস্য।
গিজার তিনটি পিরামিড নির্মিত হয়েছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিশরের সবচেয়ে বিখ্যাত গিজার তিনটি পিরামিড নির্মিত হয়েছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ফারাও খুফুর পিরামিড, যা একসময় প্রায় ১৪৬ মিটার উঁচু ছিল। এত বিশাল কাঠামো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল সেই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।
পিরামিড ছিল মৃত্যুর পর আরেক জীবনের শুরু
প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং আরেক জীবনের সূচনা। তাই মৃত্যুর পরও যেন রাজা আগের মতোই জীবনযাপন করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হতো বিশাল সমাধি। ফারাওদের দেহ বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হতো, যা আজ মমি নামে পরিচিত। দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ বের করে বিশেষ রাসায়নিক ও ন্যাট্রন লবণের সাহায্যে দীর্ঘদিন অক্ষত রাখার ব্যবস্থা করা হতো। এরপর মূল্যবান কাপড়ে জড়িয়ে সোনার কফিনে রাখা হতো মমি।
এই মমিও আরেক রহস্য। এর বিশেষ প্রক্রিয়া কীভাবে পাঁচ হাজার বছর আগে মিশরীয়রা আবিষ্কার করেছিলেন তার উত্তর খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছেন গবেষকরা। সে যাই হোক। মৃত্যুর পরও যেন রাজা আগের মতোই জীবনযাপন করতে পারেন এজন্য ফারাওদের মমির পাশে রাখা হতো খাবার, পোশাক, অস্ত্র, অলংকার, আসবাবপত্র, এমনকি কখনো কখনো পোষা প্রাণীর মমিকৃত দেহও। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল, পরকালেও এসব জিনিসের প্রয়োজন হবে।
১৯২২ সালে রাজা টুটানখামেনের সমাধি আবিষ্কার হয়
পিরামিডের ভেতরে আসলে কী রয়েছে
বাইরে থেকে পিরামিডকে যতটা সরল মনে হয়, ভেতরের কাঠামো ততটাই জটিল। সরু করিডর, গোপন পথ, বাতাস চলাচলের জন্য তৈরি শ্যাফট এবং একাধিক কক্ষ নিয়ে নির্মিত হয়েছিল এসব সমাধি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল ‘কিংস চেম্বার’, যেখানে রাখা হতো ফারাওয়ের সারকোফাগাস বা পাথরের কফিন। কিছু পিরামিডে ‘কুইন্স চেম্বার’ ও অন্যান্য গোপন কক্ষও রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখনো নতুন নতুন ফাঁপা কক্ষ বা অজানা স্থান শনাক্ত হচ্ছে, যা এই রহস্যকে আরও গভীর করেছে।
কিন্তু কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই বিস্ময়?
পিরামিড নির্মাণের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো এর নির্মাণপ্রক্রিয়া। প্রতিটি পাথরের ওজন ছিল গড়ে ২ থেকে ১৫ টন, আর কিছু গ্রানাইট ব্লকের ওজন ৭০ টনেরও বেশি। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিক দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে র্যাম্প তৈরি করে ধীরে ধীরে এসব পাথর উপরে তুলেছিলেন। একসময় মনে করা হতো, এসব নির্মাণে কেবল দাসদের ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় শ্রমিকদের আবাসন, খাদ্য ও চিকিৎসার প্রমাণ মিলেছে, যা থেকে ধারণা করা হয় তারা ছিলেন প্রশিক্ষিত ও পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত কর্মী। তবু প্রশ্ন থেকেই যায় এত নিখুঁতভাবে কোটি কোটি পাথর বসানো হয়েছিল কীভাবে? আধুনিক প্রকৌশলীরাও এই নিখুঁততা দেখে বিস্মিত হন।
প্রাচীন মিশরের দেয়ালচিত্র বা হায়ারোগ্লিফে নানান ধরনের চিত্র আঁকা
পিরামিডের যত রহস্য, মিথ আর অভিশাপ
পিরামিডকে ঘিরে অসংখ্য কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ‘ফারাওয়ের অভিশাপ’। বিশ্বাস করা হয়, যারা সমাধি লুট করেন বা অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করেন, তাদের ওপর নেমে আসে অমঙ্গল।
বিশেষ করে ১৯২২ সালে রাজা টুটানখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর অভিযানে জড়িত কয়েকজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু এই কিংবদন্তিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। যদিও বিজ্ঞানীরা এসব ঘটনার পেছনে প্রাকৃতিক কারণ, ব্যাকটেরিয়া বা কাকতালীয় ঘটনাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
পিরামিড ভিনগ্রহের প্রাণীদের তৈরি!
আবার অনেকে দাবি করেন, ভিনগ্রহের প্রাণীরা নাকি পিরামিড নির্মাণে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু মানুষ প্রাচীন মিশরের দেয়ালচিত্র বা হায়ারোগ্লিফে এমন কিছু আকৃতি দেখিয়ে দাবি করেন, সেগুলো নাকি মহাকাশযান বা এলিয়েনের ছবি। তবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এগুলো ধর্মীয় প্রতীক, দেব-দেবীর চিত্র বা শিল্পরীতির অংশ; এলিয়েনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কের প্রমাণ নেই।
সুইস লেখক এরিখ ভন ড্যানিকেন ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তার বই ‘চ্যারোটিকস অব দ্য গডস
গিজার মহান পিরামিডে প্রায় ২৩ লাখেরও বেশি পাথরের ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অনেক ব্লকের ওজন ২–১৫ টন, আর কিছু গ্রানাইট ব্লকের ওজন ৫০-৮০ টনের কাছাকাছি। এত ভারী পাথর হাজার হাজার বছর আগে কীভাবে সরানো হয়েছিল, এই প্রশ্ন থেকেই এলিয়েন তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
পিরামিড চার দিকের (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম) সঙ্গে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্য রেখে নির্মিত। অনেকের দাবি, এত নিখুঁত পরিমাপ তখনকার মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে আধুনিক গবেষণা বলছে, প্রাচীন মিশরীয়রা জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জরিপবিদ্যায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।
কিছু মানুষ প্রাচীন মিশরের দেয়ালচিত্র বা হায়ারোগ্লিফে এমন কিছু আকৃতি দেখিয়ে দাবি করেন, সেগুলো নাকি মহাকাশযান বা এলিয়েনের ছবি। তবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এগুলো ধর্মীয় প্রতীক, দেব-দেবীর চিত্র বা শিল্পরীতির অংশ; এলিয়েনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কের প্রমাণ নেই।
তবে সুইস লেখক এরিখ ভন ড্যানিকেন ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তার বই ‘চ্যারোটিকস অব দ্য গডস’-এ দাবি করেন, প্রাচীন পৃথিবীর অনেক স্থাপনা, বিশেষ করে মিশরের পিরামিড, ভিনগ্রহের প্রাণীদের সহায়তায় নির্মিত হতে পারে। পরে বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠান, বিশেষ করে অ্যান্সাইন্ট অ্যালাইন্স এই ধারণাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
পিরামিড শুধু সমাধি নয়, জ্ঞানেরও প্রতীক
গবেষকদের মতে, পিরামিড নির্মাণে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। চারটি দিককে প্রায় নিখুঁতভাবে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের সঙ্গে মিলিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল গিজার পিরামিড। সূর্যের অবস্থান, নক্ষত্রের গতিপথ এবং ঋতু পরিবর্তনের বিষয়েও প্রাচীন মিশরীয়দের গভীর জ্ঞান ছিল বলে ধারণা করা হয়।
আজও বিজ্ঞানীরা লেজার স্ক্যানিং, কসমিক-রে ইমেজিং এবং থ্রিডি প্রযুক্তির সাহায্যে পিরামিডের অজানা অংশ অনুসন্ধান করছেন। প্রায় প্রতি কয়েক বছর পরপরই নতুন কোনো তথ্য বা গোপন কক্ষের ইঙ্গিত মিলছে।
ফারাওদের জীবন, মমি সমাধি যেমন আজও মানুষকে ভাবায়
পিরামিড রহস্যের আকর্ষণ আজও অমলিন
পৃথিবীতে অসংখ্য স্থাপত্য রয়েছে, কিন্তু খুব কম নির্মাণই মানুষের কৌতূহলকে এত দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে পেরেছে। পিরামিড শুধু প্রাচীন মিশরের রাজাদের সমাধি নয়; এটি মানুষের মেধা, বিশ্বাস, প্রযুক্তি ও সভ্যতার এক অমূল্য দলিল।
হাজার বছরের গবেষণার পরও এর সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কীভাবে এত বিশাল স্থাপনা তৈরি হয়েছিল, সব গোপন কক্ষ কি আবিষ্কৃত হয়েছে, নাকি এখনো মরুভূমির বালুর নিচে লুকিয়ে আছে আরও অজানা ইতিহাস এসব প্রশ্নই পিরামিডকে আজও বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় স্থাপত্যগুলোর একটি করে রেখেছে। আর হয়তো এই অমীমাংসিত রহস্যই প্রতি বছর লাখো মানুষকে টেনে নিয়ে যায় মিশরের মরুভূমিতে, ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি নিজের চোখে দেখার জন্য।
সূত্র: হিস্টোরি ডটকম, অ্যান্সাইন্ট অরিজিন
কেএসকে








