তার সামনে পর পর দুই বার বিশ্বকাপ জেতার হাতছানি। ১৯ জুলাই ফাইনালে স্পেনকে হারাতে পারলেই পরপর ২ বার ওয়ার্ল্ডকাপ চ্যাম্পিয়ন হবে আর্জেন্টিনা। পাশাপাশি লিওনেল মেসিও টানা ২ বার বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরতে পারবেন। ভাবছেন, তাহলেই তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের সেরা হয়ে যাবেন মেসি?
বিষয়টি এমন নয় যে, তার আগে আর কেউ ২ বার টানা বিশ্বকাপ জেতেননি। জিতেছেন। নামী, দামি ও বড় তারকাদের মধ্যে ফুটবল কিংবদন্তি পেলেরই শুধু আছে পর পর ২ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব।
টানা ২ বারই শুধু নয়, পেলের আছে একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিন-তিনবার ব্রাজিলের জার্সি গায়ে বিশ্বসেরার দুর্লভ কৃতিত্ব।

১৯৫৮, ১৯৬২ আর ১৯৭০-এই তিন আসরে পেলেকে নিয়ে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রাজিল। প্রতিবার পেলে ছিলেন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও অপরিহার্য সদস্য।
ফুটবলের আরেক বড় নাম ডিয়েগো ম্যারাডোনার সামনেও ছিল পর পর ২ বার বিশ্বসেরা হওয়ার সুযোগ। ১৯৮৬ সালের পর ১৯৯০ সালে ফাইনালে জার্মানির কাছে না হেরে জিতলেই পেলেকে ছুঁয়ে ফেলতে পারতেন ম্যারাডোনা। কিন্তু তিনি এবং তার দল আর্জেন্টিনা তা পারেনি।
ফিরে দেখা যাক সেই ইতিহাস। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে যে জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্বের সেরার মুকুট জিতেছিল, ৪ বছর পর ১৯৯০ সালে আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে সেই দলেরই সামনে পড়েছিল আলবিসেলেস্তেরা।

ওই ফাইনাল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। কেননা সেটি ছিল এক বিরল ঘটনা। ১৯৮৬ আর ১৯৯০ সালে পর পর ২ বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার নতুন নজির গড়ে আর্জেন্টিনা আর জার্মানি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে পর পর ২ আসরের ফাইনালে আগে এবং এখন পর্যন্ত পর পর দুইবার একই দল ফাইনাল খেলেনি। সেই বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ফাইনালে বিতর্কিত পেনাল্টি গোলে হেরে রানার্সআপ হয়ে তুষ্ট থাকতে হয় আর্জেন্টিনাকে।
তিন তিনজন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় ক্লাদিও ক্যানিজিয়া, রিকার্দো জিউস্তি আর হুলিও ওলার্তিকোয়েচা পর পর ২ ম্যাচে হলুদ কার্ড পাওয়ায় ফাইনালে খেলতে পারেননি। প্রথম একাদশের ৩ জন খেলোয়াড় ছাড়া মাঠে নেমে আর্জেন্টিনা ছিল খানিক রক্ষণাত্মক। ম্যারাডোনার পাশাপাশি বুরুচাগা, অস্কার রুগেরি আর সার্জিও বাতিস্তাদের গতি-মন্থরতার বিপরীতে লোথার ম্যাথাউসের গতিশীল নেতৃত্ব, প্রচণ্ড গতি, মাঝেমাঝে টমাস হ্যাসলারের সৃষ্টিশীল নৈপুণ্য, ইয়ুর্গেন কোহলারের টাফ ডিফেন্ডিং আর রুডি ফোলার ও ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের মতো দুই দু'জন বিশ্বমানের স্ট্রাইকারের দক্ষতার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেনি আর্জেন্টিনা।

বল নিয়ন্ত্রণ ছিল জার্মানির দখলে। তারপরও আর্জেন্টিনাদের রক্ষণাত্মক কৌশলটাই কাল হয়। সঙ্গে রেফারির ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্ত; সব মিলে শেষ হাসি হাসে লোথার ম্যাথাউসের দল। খেলার ৮৫ মিনিটে জার্মান ফরোয়ার্ড রুডি ফোলারকে আর্জেন্টিনার রবার্তো সেনসিনি ফাউল করলে রেফারি এদগার্দো কোদেসাল পেনাল্টির নির্দেশ দেন। টিভি রিপ্লে দেখে অনেকেরই মত, ফাউল তত গুরুতর ছিল না। রেফারি কোদেসাল পেনাল্টির বাঁশি নাও বাজাতে পারতেন। পেনাল্টি থেকে জার্মানির আন্দ্রেয়াস ব্রেমে গোল করে জার্মানিকে জিতিয়ে দেন।
দীর্ঘদিন পর এবার আবার লিওনেল মেসিও টানা দুইবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবেন। তবে মেসির প্রতিপক্ষ স্পেন তত টাফ দল নয়। বরং সফট। যারা ‘টাচি’ ফুটবল খেলে অভ্যস্ত। নিজেদের বল পজিশন রাখতেই স্প্যানিশরা বেশি আগ্রহী।
আর আর্জেন্টিনাও সেই ৯০-এর মতো একঝাঁক সিনিয়র প্লেয়ারে গড়া রক্ষণাত্মক দল নয়। বরং তেড়ে-ফুঁড়ে আক্রমণ করতে অভ্যস্ত। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়ে খেলায় ফিরতে রীতিমতো অভ্যস্ত ও পারদর্শী এক উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত দল। যে দলের প্রাণশক্তি মেসি নিজে। মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের সঙ্গে সমন্বয় এবং ডান দিক ঘেঁষে আক্রমণের উৎস গড়ায় মেসি এখনো তুলনাবিহীন।

পুরো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার এতদূর আসার পেছনে প্রধান কৃতিত্ব মেসির। তার সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল আর গোল করার দক্ষতায় আর্জেন্টিনা এখন দুর্দান্ত, দুর্মনীয় এক দল। অনেকেরই মত, সেই প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক দিয়ে শুরু করা মেসি প্রতি খেলায় যে দক্ষতা ও কার্যকারিতা দেখিয়েছেন, তা বজায় থাকলে আর্জেন্টিনাকে আটকে রাখা কঠিন হবে স্পেনের জন্য।
সেক্ষেত্রে মেসির হাত ধরে এবার টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা বেশি আর্জেন্টিনার। অন্তত সমর্থকরা সেই আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছেন।
আগামী রোববারের ফাইনালে আর্জেন্টিনা জিতলে ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে আরও এক ধাপ ওপরে উঠে যাবেন। যেখানে তার সঙ্গে পাশাপাশি মঞ্চে থাকবেন শুধু পেলে। কারণ বিশ্ব তারকাদের মধ্যে পেলে ছাড়া আর কারও পর পর ২ বার বিশ্বকাপ বিজয়ের কৃতিত্ব নেই।
মেসি কি তা পারবেন? ম্যারাডোনার শ্রেষ্ঠত্ব নিজের কাছে নিয়ে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবেই কি শেষ করবেন তার ক্যারিয়ার? সেটাই এখন দেখার।
এআরবি/এমএমআর








