নব্বইয়ের দশকের স্মৃতি, বর্তমানের সৃজনশীলতা এবং আগামী দিনের সম্ভাবনাকে এক সুতোয় গেঁথে সাজানো হয়েছিল ‘মার্ভেল অব টুমরো’ সিজন ৫

বাংলাদেশের ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনগুলোর একটি ‘মার্ভেল অব টুমরো’ এবার পঞ্চম আসরে এসে যেন নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। কেবল পুরস্কার বিতরণ নয়, বরং নব্বইয়ের দশকের স্মৃতি, বর্তমানের সৃজনশীলতা এবং আগামী দিনের সম্ভাবনাকে এক সুতোয় গেঁথে সাজানো হয়েছিল পুরো অনুষ্ঠান। ঢাকার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এই সন্ধ্যা হয়ে ওঠে কনটেন্ট নির্মাতা, শিল্পী এবং সংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য উদ্‌যাপন।

নব্বইয়ের নস্টালজিয়া আর ডিজিটাল ভবিষ্যতের হাতছানি দেখা যায় এবারের আয়োজনে

ফিরে দেখা শেকড়, ছুঁয়ে দেখা ভবিষ্যৎ

এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ব্যাক টু দ্য অরিজিন’। নামের মধ্যেই ছিল শেকড়ে ফেরার আহ্বান। বর্তমানের ডিজিটাল দুনিয়ার দ্রুত বিকাশের পেছনে যে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে, সেই যাত্রাকেই সম্মান জানিয়েছে আয়োজনটি। পুরো ভেন্যুজুড়ে ছিল নব্বইয়ের দশকের আবহ। রেট্রো সাজ, পোলকা ডট, সাদাকালো নকশা, পুরোনো দিনের টেলিভিশন স্মৃতি। সব মিলিয়ে অতিথিরাও যেন ফিরে গিয়েছিলেন এক নস্টালজিক সময়ে।

রেড কার্পেটে ডিজিটাল তারকাদের মিলনমেলা

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ছিল বর্ণিল রেড কার্পেট। সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশের জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন অঙ্গনের পরিচিত মুখ। রেড কার্পেটের পাশাপাশি ছিল ফটোবুথ, লাইভ সাক্ষাৎকার, গেমস এবং দর্শকদের জন্য নানা ইন্টারঅ্যাকটিভ আয়োজন, যা পুরো সন্ধ্যাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। মঞ্চে ফিরে এল নব্বইয়ের সোনালি সময়।

এসেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের নজরকাড়া কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা
ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পীসহ বিভিন্ন অঙ্গনের পরিচিত মুখ দেখা দেন এই অনুষ্ঠানে

উদ্বোধনী পরিবেশনাই ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম বড় আকর্ষণ। নাটক, নৃত্য এবং ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনার মাধ্যমে দর্শকদের ফিরিয়ে নেওয়া হয় বাংলাদেশের টেলিভিশনের সোনালি সময়ে। হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় চরিত্র তিতলী, কঙ্কা ও আনিস যেন সময় ভ্রমণ করে এসে মিলিত হয় বর্তমান প্রজন্মের কনটেন্ট নির্মাতাদের সঙ্গে।

মঞ্চে হাজির হন টেলিভিশনের একের পর এক কিংবদন্তি চরিত্র

সেই সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত হন বিটিভির কিংবদন্তি উপস্থাপক হানিফ সংকেত, সংশপ্তকের কানকাটা রমজান, মিনা-রাজুসহ একের পর এক পরিচিত চরিত্র।
পুরোনো দিনের বিজ্ঞাপন, নাচ আর জনপ্রিয় সব স্মৃতি দর্শকদের আবেগে ভাসিয়ে দেয়। সবশেষে মনোজ প্রামাণিক যখন বাকের ভাইয়ের রূপে মঞ্চে ওঠেন, তখন পুরো হলজুড়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস।

সম্মাননা পেলেন ২৫ কনটেন্ট নির্মাতা

এবারের আসরে ২৫টি বিভাগে দেশের সেরা কনটেন্ট নির্মাতাদের সম্মাননা দেওয়া হয়। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, বরং সৃজনশীলতা, ধারাবাহিকতা, সামাজিক প্রভাব এবং নতুনত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিনোদন, ফ্যাশন, প্রযুক্তি, ভ্রমণ, রান্না, ফুড ভ্লগ, ক্রীড়া বিশ্লেষণ, পডকাস্ট, গেমিং, সমাজকল্যাণ, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি, ম্যাজিকসহ নানা বিভাগে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার।

ফ্যাশনে বিজয়ী হয়েছেন ডিজাইনার তানহা শেখ
জেফার বিজয়ী হয়েছেন সংগীতে

কিংবদন্তিদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা

পুরো সন্ধ্যার সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল বাংলাদেশের ১৩ জন সাংস্কৃতিক কিংবদন্তিকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান।

কালোত্তীর্ণ অভিনেত্রী দিলারা জামান, অভিনেতা আজিজুলহাকিমসহ অনেককে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়

দিলারা জামান, আজিজুল হাকিম, শহীদুজ্জামান সেলিম, রিচি সোলায়মান, সাদিয়া ইসলাম মৌ, শিবলী মোহাম্মদ, জুয়েল আইচ, ফেরদৌস ওয়াহিদসহ দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের গুণী ব্যক্তিদের সম্মান জানানো হয় তাঁদের আজীবনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে। এই অংশে দর্শকদের আবেগও ছিল চোখে পড়ার মতো। নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের কাছে এটি ছিল শেকড়কে সম্মান করার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

দুই প্রজন্মের সুরেলা মিলন

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আমিন হান্নান ও রাফসান সাবাব। প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই ছিল ছন্দ। শেষ পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন কাইয়ূম, শানু ও সন্ধি। নব্বইয়ের শিল্পী এবং বর্তমান প্রজন্মের পারফর্মারদের এক মঞ্চে দেখা যাওয়ায় তৈরি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক সংযোগ। শুধু অ্যাওয়ার্ড নয়, নির্মাতাদের ভবিষ্যতেরও উদ্‌যাপন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আমিন হান্নান ও রাফসান সাবাব


পাঁচ বছরে ‘মার্ভেল অব টুমরো’ শুধু একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের ডিজিটাল নির্মাতাদের জন্য একটি স্বীকৃতির প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
এবারের আয়োজনও প্রমাণ করেছে ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের কাজ এখন কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের সৃজনশীল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নব্বইয়ের নস্টালজিয়া আর ভবিষ্যতের স্বপ্নকে একসঙ্গে ধারণ করে ‘মার্ভেল অব টুমরো’ আবারও জানিয়ে দিল, ভালো গল্পের কোনো প্রজন্ম নেই। ভালো গল্প শুধু মানুষকে এক করে।

ছবি: হাল ফ্যাশন ও ফেসবুক