এক চোখ বন্ধ করে, চোখের মণি না নাড়িয়ে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে দেখো তো। দৃষ্টির এক কোণায় আবছা মতো একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে না? ওটাই কিন্তু তোমার নাক। আমরা যতক্ষণ জেগে থাকি, নাক কিন্তু সারাক্ষণ আমাদের চোখের সামনে থাকে। তা–ও আমরা বেশির ভাগ সময় বুঝতেই পারি না যে নাকটা সেখানে আছে। কিন্তু চোখের ঠিক সামনে থাকার পরও নাক কেন আমাদের নজরে পড়ে না?

যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী মাইকেল ওয়েবস্টার বলেন, ‘আমরা কিন্তু চাইলে আমাদের নাক দেখতে পারি। আসল বিষয় হলো, আমরা বেশির ভাগ সময় এটা নিয়ে মাথা ঘামাই না।’

আমাদের চোখ কেন সব সময় নাককে এড়িয়ে যায়, তার পেছনে চমৎকার কারণ আছে। আমরা পৃথিবীকে যেভাবে দেখি, আমাদের চোখ কিন্তু হুবহু সেই ছবি আমাদের দেখায় না; বরং আমাদের মস্তিষ্ক চারপাশের দুনিয়ার একটা বিশেষ মডেল তৈরি করে আমাদের সামনে তুলে ধরে, যা আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।

গন্ধ নিয়ে এই তথ্যগুলো কি তুমি জানতে?

আমরা চোখ দিয়ে যা দেখি, তা আসলে আমাদের চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে মস্তিষ্কের একটা আগাম অনুমান মাত্র। মানুষের মস্তিষ্ক সব সময় নতুন ও অদ্ভুত বিষয়গুলো খুঁজে বের করতে চায়। চারপাশের কী কী জিনিস বদলে যাচ্ছে, কোথায় বিপদ আছে কিংবা কোন জিনিসটা হঠাৎ আলাদা লাগছে। কিন্তু নিজের নাক তো সব সময় একই জায়গায় থাকে। এটা সম্পর্কে মস্তিষ্ক আগে থেকেই সব জানে। তাই নাক নিয়ে নতুনভাবে ভাবার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। সারাক্ষণ চোখের সামনে থাকা নাকের দিকে মনোযোগ দিলে মস্তিষ্কের ফালতু শক্তি অপচয় হতো, যা একধরনের বড় ঝামেলাই বটে।

বেঁচে থাকার লড়াইয়ের দিক থেকে ভাবলে মস্তিষ্কের এই সিদ্ধান্ত কিন্তু একদম বুদ্ধিমানের মতো। যখন তোমাকে কোনো বিপদ থেকে বাঁচতে হবে, খাবার খুঁজতে হবে কিংবা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে হবে, তখন নাকের মতো একটা চেনা জিনিস নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকা মানে তো শক্তির অপচয়। এ কারণে বাইরের জগৎকে যাতে আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারি, সে জন্য আমাদের মস্তিষ্ক নিজের শরীরের এমন অনেক চেনা তথ্য নিজে থেকে বাদ দিয়ে দেয়।

যেমন আমাদের চোখের রক্তনালিগুলোর কথাই ধরা যাক। চোখের যে কোষগুলো বাইরের আলো শোষণ করে নেয়, সেগুলো থাকে চোখের একদম পেছনের দিকে। আর এই কোষগুলোর ঠিক সামনেই থাকে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রক্তনালি। বিষয়টি অনেকটা এমন যে তুমি একটা মরা ডালপালাওয়ালা গাছের ভেতর বসে আছ এবং সেই ডালপালার ফাঁকফোকর দিয়েই বাইরের পৃথিবীকে দেখছ।

আমাদের মস্তিষ্ক সারাক্ষণ এই রক্তনালির ছবিগুলোকে এডিট করে বাদ দিয়ে দেয় বলেই আমরা এগুলো দেখতে পাই না। তবে বিশেষ উপায়ে চোখের এই রক্তনালিগুলোকেও কিন্তু দেখা যায়। চোখের ডাক্তাররা যখন পরীক্ষার সময় চোখের ওপর টর্চের মতো তীব্র আলো ফেলেন, তখন চোখের সামনে কিছু কালো আঁকাবাঁকা দাগ দেখা যায়। এগুলো আসলে চোখের ভেতরে থাকা সেই রক্তনালিগুলোরই ছায়া।

অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া প্রথম ডাইনোসরের জীবাশ্ম কোনটি

আমাদের মস্তিষ্ক যে শুধু অপ্রয়োজনীয় তথ্য বাদ দেয়, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় এটি নিজের মতো করে নতুন তথ্য তৈরিও করে নেয়। মানুষের চোখে ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা একটা অন্ধবিন্দু থাকে। চোখের যে অংশটি থেকে অপটিক স্নায়ু বা মেইন রগটি মস্তিষ্কের দিকে চলে গেছে, সেখানে আলো চেনার মতো কোনো কোষ থাকে না। এই অন্ধবিন্দু আমাদের চোখের সামনে এতটা জায়গাজুড়ে থাকে, যা আকাশের পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে আকারে দ্বিগুণের বেশি বড়। অথচ এত বড় একটা ফাঁকা জায়গা চোখের সামনে থাকার পরও আমরা কিন্তু কিছু টের পাই না।

আমাদের মস্তিষ্ক আসলে চারপাশের অবস্থা দেখে সেই ফাঁকা জায়গাটি নিজে থেকেই পূরণ করে নেয়। আমরা যখন কোনো সাদা কাগজের দিকে তাকাই, তখন ব্লাইন্ড স্পটের চারপাশে থাকা সাদা রং দেখে মস্তিষ্ক নিজে থেকেই অনুমান করে নেয় যে ফাঁকা অংশটিও সাদাই হবে। এভাবেই মস্তিষ্ক আমাদের পুরো দৃষ্টির ফাঁকফোকরগুলো ঢেকে দেয়।

নাকের এই ব্যাপার কিন্তু তুমি এখনই নিজে নিজে পরীক্ষা করে দেখতে পারো। এই মুহূর্তে তুমি নাক নিয়ে পড়ছ। তাই দেখবে তোমার অজান্তেই হুট করে নজরটা নিজের নাকের ওপর চলে গেছে। তুমি সেটা দেখতে পাচ্ছ। তুমি যখন নিজে থেকে কোনো জিনিসের দিকে মন দেবে, তখন তোমার মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই সেটা তোমাকে দেখাবে।

চোখের সামনে থেকেও নাক অদৃশ্য হয়ে থাকার পেছনে বিজ্ঞানের এক দারুণ রহস্য লুকিয়ে আছে। আসলে আমাদের চোখ কিন্তু কোনো ক্যামেরা নয় যে সামনে যা পাবে, হুবহু তা–ই রেকর্ড করে দেখাবে। চোখ বরং একজন চালাক শিল্পীর মতো। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য চারপাশের দুনিয়ার যতটুকু জানা দরকার, ঠিক ততটুকুই আমাদের সামনে ফুটিয়ে তোলে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স১৩৮ বছরের অভিযানের গল্প নিয়ে তৈরি হলো ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের নতুন জাদুঘর