সাড়ে ৯’শ জনবল প্রস্তাবের ফাইল মন্ত্রণালয়ে ঝুলছে বিমানবন্দরে প্রতিবছর ১ কোটি ১০ লাখ যাত্রীর যাতায়াত ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্য, কিন্তু জনবল ও আধুনিক সার্ভার সংকটে থার্ড টার্মিনাল!
রেমিট্যান্স যোদ্ধাসহ যাত্রীদের কষ্টের আশংকাঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত ‘থার্ড টার্মিনাল’ আগামী ডিসেম্বর মাসেই চালু করার চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা বা টার্গেট নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দৃশ্যমান অবকাঠামো আর নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে এটি এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। তবে এই চোখধাঁধানো ভবনের আড়ালে রয়ে গেছে এক বড় দুশ্চিন্তা।দেশী-বিদেশী যাত্রীদের আসা-যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশনসহ বিভিন্ন পয়েন্টে সেবা দেওয়ার জন্য যে বিপুল পরিমাণ দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, তা এখনো নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার এই টার্মিনালটি চালু হলেও জনবল সংকটে যাত্রীদের ভোগান্তি কমার চেয়ে উল্টো বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।৬ মাস ধরে ফাইলেই বন্দি ৯০০ জনের প্রস্তাবসংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, থার্ড টার্মিনালের কার্যক্রম পুরোদমে সচল করতে অন্তত ৯০০ জনের বেশি নতুন জনবল চেয়ে প্রায় ছয় মাস আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, গতকাল পর্যন্ত সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বর্তমানে বিমানবন্দরের পুরনো টার্মিনালে ইমিগ্রেশন বিভাগে প্রায় ৬০০ জন সদস্য ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে দিনরাত দায়িত্ব পালন করছেন।এর মধ্যে অসুস্থতা, জরুরি ছুটিসহ নানা কারণে অনেকেই অনুপস্থিত থাকলে দ্রুত ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা চরম কষ্টকর হয়ে পড়ে। তখন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রেমিটেন্স যোদ্ধা ও সাধারণ যাত্রীদের ক্ষোভ ও ভোগান্তির শেষ থাকে না। এই ভোগান্তির অভিযোগ বিমান থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়, যার ফলে কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।পুরনো সার্ভারের জটলা ও ৬০ কোটির নতুন চ্যালেঞ্জজনবলের পাশাপাশি আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা। বিমানবন্দরে এখনো পুরনো ও ধীরগতির সার্ভার দিয়ে ইমিগ্রেশনের কাজ চালানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন টার্মিনালের বিশাল চাপ সামলাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন সার্ভার সিস্টেম স্থাপন ও তা আপডেট করা বাধ্যতামূলক। একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, "থার্ড টার্মিনাল চালুর আগে জরুরি ভিত্তিতে নতুন সার্ভার সিস্টেম স্থাপন করা দরকার।"তবে নতুন সার্ভার সিস্টেম চালু করতে হলেও কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার বড় অংকের বরাদ্দের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সিনিয়র কর্মকর্তারা। স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও ইমিগ্রেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে এসবি-তে ৫ হাজার ৬শর বেশি জনবল রয়েছে। তবে বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও আধুনিকায়ন আরও জোরদার করতে মন্ত্রণালয়ে আরও ৯০০ জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যা দ্রুত পাস হওয়া জরুরি।১ কোটি ১০ লাখ যাত্রীর নিরাপত্তা ও চোরাচালান রোধের চ্যালেঞ্জসিনিয়র কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ যাত্রী আসা-যাওয়া করেন, যার অর্থ মাসে প্রায় ৯ লাখের বেশি যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের ইমিগ্রেশন, শুল্ক ও চেকিং প্রক্রিয়ার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল অপরিহার্য। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতেও জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে অপরাধ দমন করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।ইমিগ্রেশন সূত্রের খবর, এই পয়েন্টগুলো ব্যবহার করে মানব পাচার, সোনা চোরাচালান, মাদক বহন এবং দেশী-বিদেশী অপরাধীদের যাতায়াত ঠেকাতে স্পেশাল ব্রাঞ্চের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মালিবাগে অবস্থিত এসবির প্রধান কার্যালয় থেকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিমানবন্দরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে।দালাল চক্রের অপতৎপরতা ও ইমিগ্রেশনের কঠোর অবস্থান
অভিযোগ রয়েছে, একটি সুসংগঠিত মানব পাচারকারী চক্র ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে ট্যুরিস্ট ভিসার মাধ্যমে বিদেশে মানুষ পাচার করছে। অনেক যাত্রী জেনেবুঝেই দালালদের খপ্পরে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। আবার অনেকে লিবিয়া হয়ে বিপজ্জনক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এ ধরনের অপরাধ রুখতে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সন্দেহভাজনদের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং পুরো চেকপোস্টকে কঠোর নজরদারির আওতায় এনেছে। তবে পোশাক ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বসার জায়গা এবং টার্মিনালে লাউঞ্জের ব্যবস্থা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত আলোচনা শেষ হয়নি।স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে দৃঢ়তার সাথে বলেন, "জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন সার্ভার পাওয়া গেলে প্রশাসন হার্ডলাইনে থেকে যে কোন ধরনের দেশী বিদেশী অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করতে বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করবে। থার্ড টার্মিনালে আধুনিক সুযোগ সুবিধা বাড়ালে সকল ধরনের পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।"








