নড়াইলের সদর উপজেলার মহিষখোলা গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির এক তেঁতুল গাছ। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অতিক্রম করে এখনো ছায়া ও ফল দিচ্ছে গাছটি। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু গাছ নয়; বরং কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানান, ব্রিটিশ শাসনামলের আগে অথবা নড়াইলের জমিদারি আমলে তেঁতুল গাছটির জম্ম হয়। তখন আশপাশে ছিল বিস্তীর্ণ বনজঙ্গল ও জমিদারদের বসতি। সময়ের পরিবর্তনে উজার হয়েছে গাছ, পাল্টেছে মানুষের জীবনযাত্রা। শতবর্ষী এই তেঁতুল গাছটি ইতিহাসের নীরব সাক্ষী একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। শিশুদের খেলাধুলা, তরুণদের আড্ডা আর বয়োজ্যেষ্ঠদের গল্পের আসর সব কিছুরই নীরব সঙ্গী এ গাছটি।
নড়াইল জেলার তিনটি উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অর্ধশতাধিক শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের দাবি, জেলার বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খাসজমি, গ্রামীণ জনপদ এবং নদ-নদীর তীরজুড়ে থাকা প্রাচীন গাছ কেটে ফেলার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে।
নড়াইল পৌর এলাকার মহিষখোলা গ্রামের বৃক্ষপ্রেমী মনির হাসান বলেন,‘শতবর্ষী বৃক্ষ শুধু গাছ নয়, এটি এক একটি জীবন্ত ইতিহাস। অনেক শিল্পী, কবি ও গীতিকার এসব গাছের নিচে বসেই সৃষ্টিশীল কাজ করেছেন।একটি গাছ কেটে ফেললে পরিবেশগত যে ক্ষতি হয়, তা নতুন চারা রোপণ করে অল্প সময়ের মধ্যে পূরণ করা সম্ভব নয়।”
নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান কেয়া রেনু রায় বলেন, “একটি শতবর্ষী গাছ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেটে ফেলা সম্ভব। এসব গাছ কেবল ফল ফলালিও অক্সিজেন দেয় না; জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অসংখ্য পাখি, প্রাণী ও কীটপতঙ্গের আবাসস্থলে পরিনত হয় গাছগুলি।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইলের সভাপতি শাহ আলম বলেন, “গত ১০ বছরে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। গাছ কাটার ফলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে গাছগুলো আছে সেগুলো দ্রুত তালিকা করে সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি।”
নড়াইল বনবিভাগের সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত ফরেস্ট রেঞ্জার কাজী ইশতিয়াক রহমান বলেন, “বর্তমানে নড়াইলের শতবর্ষী গাছের কোনো তালিকা বন বিভাগের কাছে নেই। দ্রুত তালিকা তৈরি করে সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
নড়াইলের জেলা প্রশাসক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল ছালাম বলেন, “জেলার শতবর্ষী গাছগুলো সংরক্ষণ করা হবে। আপাতত নড়াইল সদর, কালিয়া উপজেলা ও লোহাগড়া উপজেলার তিনটি গাছের চারপাশে ইটের গাঁথুনি দিয়ে পথচারী ও এলাকাবাসীর বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হবে।”








