বয়স ১৬ বছর, হতে চান নেইমার। মাঠে নেমে পায়ের জাদুতে প্রতিপক্ষকে নাচানোই তাঁর স্বপ্ন। ড্রিবলিংয়ে এলোমেলো করতে চান প্রতিপক্ষকে। এই বয়সে মানুষের তো কত রকম স্বপ্নই থাকে। কিন্তু সব স্বপ্ন কি পূরণ হয়!

অনেকের আবার হয়। সব বাধা ভেঙে প্রতিভার ঝলকানিটা বেরিয়ে আসে। আন্তোনিও নুসা এমন একজন। নেইমারের মতো হওয়ার স্বপ্নটা মনে মনে পুষে পাঁচ বছর পর তিনি ঠিকই ‘নেইমার’ হয়েছেন। নরওয়ের ফুটবলে তাঁর পরিচিতিটা এখন ‘নওরেজিয়ান নেইমার’ নামে।

নুসার শক্তির জায়গা তাঁর ড্রিবলিং। নেইমারের প্রেমেও তিনি পড়েছেন ড্রিবলিং দেখেই। ২০২১ সালের ১৬ বছর বয়সী নুসার মুখেই শুনুন, কেন তিনি নেইমারকে ভালোবাসেন, ‘আমার আদর্শ নেইমার। আমি চাই তাঁর মতো ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষকে এলোমেলো করে দিতে।’

সেই স্বপ্ন এবং মাঠকাঁপানো ড্রিবলিং নুসা করে দেখিয়েছেন এবারের ফুটবল বিশ্বকাপেও। এই তো সর্বশেষ ম্যাচেই শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে আইভরিকোস্টের বিপক্ষে।

সেদিন মার্টিন ওডেগার্ডের পাস থেকে নুসা বলটি ডান পায়ে নিয়ে পোস্টের কোণ মেপে যে শটটা নিলেন, সেটাকে দুর্দান্ত না বলে উপায় নেই। টপ-রাইট কর্নার দিয়ে তাঁর সেই গোল আইভরিকোস্ট গোলরক্ষক শুধু চেয়ে চেয়েই দেখেছেন।

গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে নুসার উদ্‌যাপন

সেই গোলে আবার লেখা হয়েছে নতুন ইতিহাসও। নরওয়ের ইতিহাসে সেটি বিশ্বকাপে তাদের সর্বকনিষ্ঠ (২১ বছর ৭৪ দিন) খেলোয়াড়ের গোলের রেকর্ড। নরওয়ে বিশ্বকাপের নকআউটে তুলে নেয় প্রথম জয়ের স্বাদ।

আজ নুসার দল নামবে ইতিহাস গড়ার গল্পে আরও একটি অধ্যায় লিখতে। মজার ব্যাপার, সেই ইতিহাস গড়ার পথে নুসার বাধা তাঁরই আদর্শ নেইমার। জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের শেষ ৩২ দলের রাউন্ডের ম্যাচে নেইমার মাঠে নামতে না পারলেও নরওয়ের বিপক্ষে তাঁর খেলা মোটামুটি নিশ্চিত।

ফিট হয়ে উঠেছেন, হয়তো স্কটল্যান্ড ম্যাচের মতোই বদলি হয়ে খেলতে পারেন। কিংবা ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি আরও বড় চমকও উপহার দিতে পারেন।

বাবাদের কাছ থেকে ব্রাজিল-জয়ের যে গল্প জেনে নিতে পারেন হলান্ডরা

নেইমারের সঙ্গে দেখা হলে কী করবেন নুসা? লড়াইয়ের ঝাঁঝের মধ্যেও কি ব্রাজিল কিংবদন্তিকে নিজের ভালোবাসার কথা জানাবেন? সময় হলেই সেটা জানা যাবে।

নুসার সঙ্গে এর আগে একবার দেখা হয়েছে নেইমারের। গত বছর নুসা তাঁর ক্লাব লাইপজিগের হয়ে ব্রাজিল সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে নেইমারের বর্তমান ক্লাব সান্তোসের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলে তাঁর দল। নুসা তখনই নিজের ভালোবাসার কথা নেইমারকে জানিয়েছেন। জার্সিটাও বদল করেছেন।

সেই রোমাঞ্চকর স্মৃতির কথা নুসার মুখেই শুনুন, ‘আমি নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সেই নেইমারের মুখোমুখি হই, যাঁকে আমি মনেপ্রাণে শ্রদ্ধা করি। সত্যিই এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত ছিল।’

এবার নেইমারের সামনে মাঠের খেলায় কোনো অবিশ্বাস্য মুহূর্ত নুসা তৈরি করতে পারেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়। নরওয়ে অবশ্য এমন কিছুর জন্য আর্লিং হলান্ডের পাশাপাশি তাঁর দিকেও তাকিয়ে থাকবে। কারণ, ২০২৩ সালে নরওয়ের মূল দলে অভিষেকের পর থেকেই নুসা দলটির মূল ভরসাদের একজন।

নরওয়ের হয়ে ৯ গোল করা এ উইঙ্গারের সামর্থ্যই তাঁকে বিশ্বকাপ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। টাচলাইন ঘেঁষে অপেক্ষায় থাকা নুসা বল পেলে বিদ্যুৎগতিতে ড্রিবলিং করে ডিফেন্স চিরে ভেতরে ঢুকতে ওস্তাদ। দুই পায়েই সমান পারদর্শী। উইং থেকে কাট-ইন করে ভেতরে ঢোকার সময় এটাই তাঁকে বাড়তি সুবিধা দেয়।

নুসার উঠে আসার গল্পটাও দুর্দান্ত

নুসার উঠে আসার গল্পটাও দুর্দান্ত। তাঁর বাবা নাইজেরিয়ান। স্বাভাবিকভাবেই নাইজেরিয়া ফুটবল ফেডারেশনের রাডারে ছিলেন। একবার তো নাইজেরিয়ার জার্সি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করেন। সেটা দেখে নাইজেরিয়ান সমর্থকেরাও দারুণ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু নরওয়েতে জন্ম নেওয়া নুসার মন পড়ে ছিল পৃথিবীর উত্তর কোণের দেশেই। বয়সভিত্তিক অনূর্ধ্ব-১৬, ১৮, ১৯, ২১ দল পেরিয়ে নুসা তাই এখন নরওয়ে জাতীয় দলে।

নেইমার কি খেলবেন, নাকি আবারও ‘মরীচিকা’

মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় নুসার। খেলেন নরওয়ের ক্লাব স্টাবায়েকের হয়ে। তাঁর উঠে আসাও স্টাবায়েকের একাডেমি থেকে। ২০২১ সালে যোগ দেন বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুগাতে। এখান থেকে কাড়তে শুরু করেন পাদপ্রদীপের আলো। এই ক্লাবের হয়ে ২০২২ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেক ম্যাচে গোল করেছিলেন মাত্র ১৭ বছর ১৪৯ দিন বয়সে। ২০২৪ সাল থেকে নুসা খেলছেন লাইপজিগে।

২০২৪ সাল থেকে নুসা খেলছেন লাইপজিগে

জার্মান ক্লাবটির হয়ে ৭ গোল করা নুসাকে অনেক বড় বড় ক্লাব এখন দলে নিতে চায়। টটেনহ্যাম হটস্পারের মতো ক্লাবও তাঁর ওপর নজর রাখছে। আর নুসার বয়স এখনো মাত্র ২১! এরই মধ্যে যেভাবে হলান্ড-ওডেগার্ডদের পাশে দাঁড়িয়ে আলো ছড়াচ্ছেন, তাতে বলাই যায়—নুসার দিন তো সামনে!