ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই টান টান উত্তেজনা। টিভিতে যখন তোমার প্রিয় দলের খেলা চলে, স্ট্রাইকার যখন বল নিয়ে বিপক্ষ দলের ডি-বক্সে ঢুকে যায়, তখন তোমার কেমন লাগে? নিশ্চয়ই দম আটকে আসে! যেই না বলটা জালে জড়ায়, অমনি তুমি কী করো? হয়তো সোফা বা বিছানা ছেড়ে একলাফে শূন্যে উঠে গিয়ে গলার সর্বোচ্চ স্বর দিয়ে চিৎকার করে গোল উদ্যাপন করো!
কিন্তু তুমি হয়তো বাসায় একা বা দুই–তিনজন ভাই-বোন বা বন্ধুদের সঙ্গে লাফাও। কিন্তু ভাবো তো, তোমার সঙ্গে যদি হাজার হাজার বা লাখ লাখ দর্শক একসঙ্গে লাফিয়ে ওঠে, তখন কী হবে?
ভাবছ, খুব বেশি হলে একটু ধুলা উড়বে বা মেঝে কাঁপবে। কিন্তু যদি বলি, তোমাদের ওই গোলের আনন্দের লাফে আস্ত একটা শহর কেঁপে উঠতে পারে এবং রীতিমতো ভূমিকম্প মাপার যন্ত্রে সেই কাঁপুনি ধরাও পড়তে পারে! হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না। কিন্তু অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটা সত্যি। এবারের বিশ্বকাপেই ঘটছে এমন ঘটনা।
জায়গাটার নাম বার্গেন। নরওয়ের খুব সুন্দর একটা শহর। এই শহরের ইউনিভার্সিটি অব বার্গেন-এর ক্যাম্পাসের একটা বেজমেন্ট বিজ্ঞানীরা একটা সাইসমোমিটার বসিয়ে রেখেছেন। নাম শুনেই হয়তো বুঝতে পারছ, এটা দিয়ে কী মাপা হয়। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ! পৃথিবীর গভীরে যখন কোনো ভূমিকম্প হয়, তার ফলে মাটির যে কম্পন তৈরি হয়, সেটা মাপার জন্যই ভূ–পদার্থবিদেরা এই যন্ত্র ব্যবহার করেন। এই যন্ত্রটা এতটাই সংবেদনশীল যে এটি এক মিলিমিটারের দশ লাখ ভাগের এক ভাগ কম্পনও একেবারে নিখুঁতভাবে মেপে ফেলতে পারে!
বিশ্বকাপে বিশ্ব কাঁপে
এবারের বিশ্বকাপে নরওয়েও দারুণ খেলছে। নরওয়ের মানুষ ফুটবল নিয়ে এমনিতেই পাগল, তার ওপর দলে আছে আর্লিং হলান্ডের মতো বিশ্বকাঁপানো স্ট্রাইকার। ১৭ জুন নরওয়ের খেলা ছিল ইরাকের বিপক্ষে। নরওয়ে সেই ম্যাচে ৪-১ গোলে জিতেছিল। বিজ্ঞানীরা পরের দিন সকালে তাঁদের সাইসমোমিটারের ডেটা চেক করতে গিয়ে তো অবাক! তাঁরা দেখলেন, আগের রাতে যন্ত্রে অদ্ভুত কিছু কম্পনের সিগন্যাল ধরা পড়েছে। কিন্তু তখন তো কোনো ভূমিকম্প হয়নি! তাহলে কাঁটা নড়ল কেন?
বিজ্ঞানীরা একটু হিসাব কষতেই আসল রহস্যটা বেরিয়ে এল। ওই দিন ম্যাচে আর্লিং হলান্ড যখন তাঁর জাদুকরি গোলগুলো করছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তগুলোতেই সাইসমোমিটারের কাঁটা লাফিয়ে উঠেছিল! অর্থাৎ মানুষ যখন হলান্ডের গোল দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠেছে, তখন সেই কম্পন মাটির নিচ দিয়ে গিয়ে সোজা সাইসমোমিটারে ধরা পড়েছে।
এ শুধু মেসি বলেই সম্ভব
বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এটা কি আসলেই সত্যি? নাকি অন্য কোনো কারণে এমনটা হলো? উত্তরটা তাঁরা পেয়ে গেলেন কয়েক দিন পরই। ২৩ জুনের মাঝরাতে নরওয়ের খেলা ছিল সেনেগালের বিপক্ষে। সেই ম্যাচটা ছিল আরও উত্তেজনার। নরওয়ে ৩-২ গোলে সেনেগালকে হারিয়ে দেয়। ওই ম্যাচেও প্রতিটা গোলের সময় সাইসমোমিটারে ধরা পড়ল ঠিক একই রকম কাঁপুনি!
কিন্তু এমনটা কীভাবে সম্ভব? এটা বুঝতে হলে একটু পদার্থবিজ্ঞান বুঝতে হবে। একটু চিন্তা করে দেখো, যখন হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে, উল্লাস করে এবং আনন্দে লাফাতে থাকে, তখন তাদের শরীরে অনেক শক্তি জন্ম হয়। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, এতগুলো মানুষের ভর যখন লাফিয়ে আবার অভিকর্ষজ ত্বরণের টানে মাটিতে আছড়ে পড়ে, তখন একটা বিশাল বল তৈরি হয়। এই শক্তি বাতাস ও ভবনের কাঠামো ভেদ করে সোজা মাটিতে গিয়ে মেশে। হাজার মানুষের লাফের ধাক্কায় মাটিতে একধরনের ঢেউ তৈরি হয়। সেই ঢেউ মাটির নিচ দিয়ে ছুটতে ছুটতে গিয়ে ধাক্কা মারে সাইসমোমিটারে। আর তাতেই ভূকম্পন মাপার যন্ত্রের কাঁটা নড়ে ওঠে!
বিশ্বকাপে খেলার মধ্যে বিরতি কেন?এর মানে কী দাঁড়াল? মানুষের আনন্দ, উত্তেজনা এবং উদ্যাপনকে এখন বিজ্ঞানীরা চাইলে সাইসমোমিটার দিয়ে মেপে ফেলতে পারেন! বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলা যায়, মানুষের আবেগ এখন পরিমাপযোগ্য।
অবশ্য খেলাধুলা বা কনসার্টের সময় মানুষের লাফালাফিতে মাটি কেঁপে ওঠার ঘটনা এটাই যে একেবারে প্রথম, তা কিন্তু নয়। এর আগেও বড় বড় রক কনসার্টে এমনটা দেখা গেছে। কিন্তু ফুটবলের মতো আসরে একটা গোটা শহরের মানুষের একসঙ্গে লাফিয়ে ওঠার কারণে ভূমিকম্প মাপার যন্ত্রে এমন ঢেউ ওঠার ঘটনা এর আগে দেখা যায়নি। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের আবেগ ও শক্তির বিশাল বিস্ফোরণ।
সূত্র: ওয়ার্ড ডটকম
উরুগুয়ের জার্সিতে কেন চার তারকা







