ধর্ষণচেষ্টার অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন আদালতের আগের কিছু রায় নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখনই নতুন এক পর্যবেক্ষণ দিলেন পাটনা হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো নারীর সালোয়ার খুলে ফেলা বা স্তন মর্দন করার ঘটনা ঘটলেও তা এককভাবে দণ্ডবিধির অধীনে ধর্ষণচেষ্টা হিসেবে গণ্য করার জন্য যথেষ্ট নয়।

ভারতীয় হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জোরপূর্বক শরীরের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা বা সুনির্দিষ্ট কোনো চরম পদক্ষেপের প্রমাণ না থাকলে সেটিকে ধর্ষণচেষ্টা বলা যাবে না।

আরও পড়ুন

ভারতে একবছরে ২০ হাজার কন্যাশিশুকে ধর্ষণ

বিহারের বাঙ্কা জেলার ২০০৮ সালের একটি মামলায় নিম্ন আদালতের সাজাপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির আপিল মঞ্জুর করে এই রায় দেন বিচারপতি পূর্ণেন্দু সিং। এর আগে নিম্ন আদালত ওই অভিযুক্তকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা অনুযায়ী ধর্ষণচেষ্টা ও বেআইনিভাবে আটকে রাখার দায়ে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের সেই রায় বাতিল করে অভিযুক্তকে খালাস দিয়েছেন।

স্টুডিওর ভেতরে সেই ঘটনা

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালের ১৯ জানুয়ারি এক তরুণী তার বাবার সঙ্গে বিহারের আমারপুরের ‘ছায়া স্টুডিও’তে ছবি তুলতে গিয়েছিলেন। ছবি তোলার পর স্টুডিওর মালিক কম্পিউটারে ছবি দেখানোর অজুহাতে তরুণীর বাবাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন। এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তি স্টুডিওর দরজা লক করে দেন।

অভিযোগ ওঠে, তিনি তরুণীর সালোয়ার খোলার চেষ্টা করেন এবং ধর্ষণের উদ্দেশ্যে তার স্তন মর্দন করেন।

আরও পড়ুন

ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় / বুকে স্পর্শ করা ধর্ষণচেষ্টা নয়, গুরুতর যৌন নিপীড়ন

তরুণী চিৎকার শুরু করলে তার বাবা দরজার দিকে ছুটে যান। তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি দরজা খুলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। স্থানীয় লোকজনও সেখানে জড়ো হন।

পরবর্তীতে নিম্ন আদালত এই ঘটনায় আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করলেও সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে পাটনা হাইকোর্টে আপিল করা হয়।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও খালাস

মামলার তথ্যপ্রমাণ ফের যাচাই করে হাইকোর্ট জানান, রাষ্ট্রপক্ষ ভুক্তভোগী ও তার পিতামাতাসহ পাঁচজন সাক্ষী হাজির করেছিল। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে আদালতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের সপক্ষে কোনো চিকিৎসকের মতামত বা মেডিকেল রিপোর্টও জমা দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন

ভারতে বাসের ভেতরে ধর্ষণ, ১০০ মিটারের মধ্যেই ছিল পুলিশ স্টেশন

হাইকোর্ট রায়ে বলেন, জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কের ন্যূনতম কোনো চেষ্টা বা অকাট্য প্রমাণ এই মামলায় নেই। মেডিকেল রিপোর্টের অনুপস্থিতিতে একে কোনোভাবেই ধর্ষণচেষ্টা বলা যায় না।

তবে আদালত এ-ও উল্লেখ করেন যে, দরজা বন্ধ করে তরুণীকে আটকে রাখা এবং সালোয়ার খোলার চেষ্টা শ্লীলতাহানির শামিল। এটি দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারার অধীনে নারীর শ্লীলতাহানির অপরাধ হলেও তা ধর্ষণচেষ্টা নয়।

এই আইনি মারপ্যাঁচে আদালত আগের সাজা বাতিল করে আসামিকে জামিন বন্ড থেকে মুক্তি দেন।

আরও পড়ুন

ভারতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যৌন অপরাধের প্রবণতা যেভাবে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিতর্কিত রায়

এর আগে, ২০১৫ সালের ১৭ মার্চ ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্টও অনূরূপ একটি রায় দিয়েছিলেন। ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা মামলায় দুই আসামিকে খালাস দিয়ে আদালত বলেছিলেন, ভুক্তভোগীর পায়জামার ফিতা খোলা বা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া অপরাধের ‘প্রস্তুতি’ মাত্র, এটি ‘ধর্ষণচেষ্টা’ নয়।

এলাহাবাদ হাইকোর্টের সেই রায় নিয়ে তখন আইনজীবী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হস্তক্ষেপ করেন এবং এলাহাবাদ হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। ভারতের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাইয়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ মন্তব্য করেছিলেন, হাইকোর্টের ওই রায় সংবেদনশীলতার চরম অভাবের বহিঃপ্রকাশ।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
কেএএ/