নৌকায় যিনি বসে আছেন, তার নাম চঞ্চল খান। বাড়ি ছোট্ট জেলা নড়াইলের তালবাড়িয়া গ্রামে। চোখ বন্ধ করলেই আজও সেই ছোটবেলার দিনগুলো ভেসে ওঠে। তিনি এক সাধারণ কৃষক পরিবারের ছেলে। বাপ-দাদার কাঁধে চেপে মাঠে যাওয়া, কাদায় পা ডুবিয়ে ধানের চারা লাগানো, আর বিলের পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখা—এই ছিল তার শৈশব।
এখন পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করেন। পোস্টিং খুলনা শহরে। বড় বড় ভবন, ইট-পাথরের রাস্তা, বড় বড় রেস্টুরেন্ট, বিদেশি খাবারের ভিড়ে দেশি খাবার আজ বিলুপ্তির পথে। কিন্তু রাতে যখন একা বসেন, তখন বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। মনটা ছুটে চলে যায় গ্রামের সেই সবুজ মাঠে, থই থই করা পানির বিলে। বিশেষ করে এই আষাঢ় মাসে। আকাশ ফেটে বৃষ্টি পড়ে, মাঠ ভেসে যায়, আর প্রিয় তালবাড়িয়ার নটডাঙ্গা বিলটা যেন জেগে ওঠে নতুন করে।
তালবাড়িয়া আর বগুড়া গ্রামের মাঝখানে এই বিল। পাশের আরও কত গ্রামের মানুষ এখানে আসেন মাছ ধরতে, শাপলা তুলতে। এখন পানি এত বেড়েছে যে চারদিক থই থই করছে। সকালবেলা নৌকায় উঠলে চোখ জুড়িয়ে যায়। শাপলা ফুলগুলো পানির ওপর ভেসে ভেসে হাসছে—সাদা, গোলাপি, কখনো লালচে। পাখির ঝাঁক উড়ছে, ডাকছে অবিরাম। একটু এগিয়ে গেলে পদ্মবিল—সেখানে পদ্মফুল ফুটে আছে। এত সুন্দর যে, মনে হয় স্বর্গের দরজা খুলে গেছে।

আনার চাষে সফল শিবলী সাদিক, বাগানে আছে ৩০০ গাছ
সেদিন ছুটি পেয়ে বাড়িতে এসেই চঞ্চলের মনটা অস্থির হয়ে উঠল। মাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘মা, আজ বিলে যাব।’ মা চোখের কোণে পানি চেপে হাসলেন। বললেন, ‘যা বাবা, সাবধানে।’ নৌকা নিয়ে একা একা চলে গেলেন নটডাঙ্গায়। বৈঠা চালাতে চালাতে চোখে পানি চলে এলো। মনে পড়ছিল বাপ-দাদার কথা। তারা যেভাবে শাপলা তুলতেন, পুঁটি মাছ ধরতেন, ভাই-বোনেরা পাশে বসে দেখতো। সেই স্মৃতি আজও বুকে জ্বলে।
বিলের মাঝখানে গিয়ে শাপলার কাণ্ড আর পাতা তুললেন চঞ্চল। জাল ফেলে কয়েকটা তাজা পুঁটি মাছও ধরলেন। পানিতে হাত ডুবিয়ে যখন শাপলা তুলছিলেন; মনে হচ্ছিল গ্রামের মাটি, বিলের পানি যেন তাকে জড়িয়ে ধরছে। ‘ফিরে আয় বাবা, এখানেই তোর ঘর’—এমনই একটা ডাক শুনতে পাচ্ছিলেন।
চঞ্চল বাড়ি ফিরতেই মা রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। হাতে-বাটা মসলা—পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা সব একসাথে বেটে। তাতে বিলের তাজা শাপলা আর পুঁটি মাছ ছেড়ে দিলেন। আঁচের আগুনে যখন রান্না হচ্ছে; সেই গন্ধে পুরো বাড়ি ভরে গেল। চঞ্চল চুপ করে বসে দেখছিলেন। মায়ের হাতের ছোঁয়ায় যেন জাদু আছে। এক চামচ মুখে দিতেই চোখ বন্ধ হয়ে গেল। কী স্বাদ! পৃথিবীর কোনো দামি হোটেলে এই স্বাদ মিলবে না। এটা শুধু তরকারি নয়—এটা মায়ের ভালোবাসা, বাপ-দাদার স্মৃতি, গ্রামের মাটির গন্ধ, বিলের তাজা পানির আশীর্বাদ।

হারিয়ে যাচ্ছে চিত্রা হরিণ, প্রকৃতি রক্ষায় করণীয় কী?
শহরে ফিরে গেলে আবার সেই হু হু ভাবটা আসবে। কিন্তু আজ অন্তত কয়েকদিনের জন্য মনটা ভরে গেছে। ভাই-বোনেরা, যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে আছেন; একবার সময় করে বাড়িতে যান। নটডাঙ্গা বিলে নৌকা ভাসান। শাপলা তুলুন, মায়ের হাতের শাপলা-পুঁটির ঝোল খান। দেখবেন, জীবনের আসল সুখ কোথায় লুকিয়ে আছে।
এসইউ








