নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় টাকা চুরির অভিযোগে এক শিশুকে (১২) মাথা ন্যাড়া করে নির্যাতন করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাঁও বাজার গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা সাতটার দিকে ওই ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে পাঁচগাঁও বাজারের হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান আরেকজন ব্যবসায়ীকে নিয়ে পাশের একটি দোকানে চা খেতে যান। এ সময় দোকানের ক্যাশবাক্সে সাড়ে আট হাজার টাকা রেখে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি দোকানে এসে টাকা না পেয়ে আশপাশের ব্যবসায়ীদের বিষয়টি জানান। এ সময় ব্যবসায়ীরা ওই শিশুকে মান্নানের অনুপস্থিতিতে তাঁর দোকানের আশপাশে ঘুরতে দেখে তাঁদের সন্দেহের কথা জানান। পরে বাজারের ব্যবসায়ীরা ওই শিশুকে খুঁজতে শুরু করেন। বাজারের উত্তর দিকের চৈতা এলাকায় শিশুটিকে পেয়ে তাকে টাকার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু সে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করলে ভয়ভীতি দেখানোর এক পর্যায়ে তার কোমরের কাছে লুঙ্গির ভাঁজে প্যাঁচানো অবস্থায় টাকা পাওয়া যায়। পরে তাকে আটক করে বাজারের শহীদ মিনারের বেদিতে রাখা হয়। সেখানে শিশুটির মাথা ন্যাড়া করে নির্যাতন চালানো হয়।
ফেসবুকে এ ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বাজারের রেইনট্রিগাছের নিচে শহীদ মিনারের বেদিতে শিশুটিকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সেখানে হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান, ওষুধ ব্যবসায়ী মুর্শিদ আলী, মান্নান সিরাজীসহ ৪০ থেকে ৫০ জন দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আর রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশের সদস্য রতন রবিদাস শিশুটির মাথা ন্যাড়া করছেন। এর আগে ডান হাতে চুল কাটার মেশিন নিয়ে বাঁ হাত উঁচু করে ছেলেটির মাথায় রেখে রতনকে বলতে শোনা যায়, ‘এই ছেলের বাড়ি...বাবার নাম...। এই ছেলে বাজারে ইতিপূর্বেও চুরি করেছে। আজকে বাজারের হার্ডওয়্যারের দোকানদার মানিক কাক্কুর দোকানে চুরি করছিল। তাকে দোকানদাররা হাতে নাতে ধরছে। তার হাতে চুরির টাকা পাওয়া গেছে। তাকে মারপিটনা দেওয়া হচ্ছে না। এখন লজ্জাজনক হিসাবে তার মাথার চুলটা কেটে দেওয়া হচ্ছে।’ এ কথা বলে যন্ত্রের সাহায্যে চুল কাটা শুরু করা হয়।
ভিডিওতে কিছুক্ষণ পর রতনকে আবার বলতে শোনা যায়, ‘নেন, এখন আপনারা এই ঘটনার সবাই ভিডিও করে ছড়িয়ে দেন। যাতে আর কেউ চুরি করার সাহস না পায়।’ এ সময় মধ্যবয়সী এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘রতন, এক্কেবারে সব চুল কাইটো না, পরিষ্কার কইরো না। খাবরা–খুবরা কইরা দাও।’ তখন আরেক ব্যক্তিকে শিশুটির উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘হাত জোড় কইরা ক, আমি আর চুরি করতাম না। কাম কইরা খাইয়াম।’ তখন রতনও বলেন, ‘ক, আমি আর চুরি করতাম না।’ এ সময় শিশুটি হাতজোড় করে সবার উদ্দেশে ওই কথা বলে। কিছুক্ষণ পর তাকে বাজার ঘুরিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ওই শিশুর চাচা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাতিজার বিরুদ্ধে টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে বাজারে এমন নির্যাতন করা হয়েছে। এত এত মানুষ উপস্থিত ছিল, কিন্তু কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি। ছোট মানুষ, যদি চুরিও করে থাকে, তবে তো তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দেওয়া যেত। আমরা গরিব মানুষ, এই ঘটনার শাস্তি চাই।’
এ বিষয়ে রতন রবিদাস ও ব্যবসায়ী আবদুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁদের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
কলমাকান্দা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সজল সরকার বলেন, ‘ভিডিওটি আমরা দেখেছি। পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশে এই মুহূর্তে আমরা অভিযানে আছি। আশা করছি, ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হব।’








