সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ‘রাজপুত্র’ হুমায়ূন আহমেদ। বিস্ময়কর প্রতিভাধর এ সব্যসাচী তার জিয়নকাঠির আলো ছড়িয়ে জনপ্রিয়তায় নিজেকে অসামান্য উচ্চতায় স্থাপন করেছিলেন। ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে সাহিত্য গগনে অতি অকস্মাৎ ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল কিংবদন্তি হুমায়ূন আহমেদের। ক্ষণজন্মা হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২) উজ্জ্বলপ্রভ এক অভিনব কণ্ঠস্বর নিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে প্রবেশ করেন জাদু বাস্তবতা নিয়ে। নাগরিক মধ্যবিত্ত, তারুণ্যশাসিত আবেগে-আকাঙ্ক্ষায় উচ্চকিত হুমায়ূন আহমেদ জীবনার্থ সন্ধানে স্বপ্নময় ভবিষ্যতে বিশ্বাসী ছিলেন। শুরু থেকেই তার উপন্যাসের ভাষা ছিল সহজ-সরল, স্বচ্ছন্দ ও গতিময়। গল্প বলার অসাধারণ এক সম্মোহনী শক্তি ছিল তার। এ গল্প বলার জাদুকরী শক্তিই তাকে অতিদ্রুত খ্যাতির চূড়ায় স্থাপন করেছিল। উত্তরকালে হুমায়ূন আহমেদ হয়ে ওঠেন জীবনরসিক, রূপদক্ষ এক অসাধারণ জননন্দিত কথাশিল্পী। তিনি অনিবার্যভাবে বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাপন ও দিনবদলের কথাকার। আজন্ম তিনি লিখে গেছেন মধ্যবিত্ত প্রেম এবং তার টানাপোড়েন। তিনি আপন প্রতিভার ক্ষুরধারে দ্রুত হয়ে ওঠেন সময়ের শ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় কথাশিল্পী। কাহিনি-বর্ণনায় টানটান উত্তেজনা, কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার বিন্যাস, চমকপ্রদ নাটকীয়তা, বৈচিত্র্যময় ও বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র সৃষ্টি এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টি হুমায়ূন আহমেদকে পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গে তুলে আনে। স্বাধীনতা-উত্তর শহরকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা নতুন মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের শিক্ষিত শ্রেণিই মূলত হুমায়ূন আহমেদের প্রধান পাঠক। একাধারে উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণ-আখ্যান, ব্যক্তিগত রচনা, আত্মজীবনী, রস-রহস্য, কবিতা, গান, নাটক, চলচ্চিত্র, ছবি আঁকা, ছোটদের রচনা, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, হিমু, শুভ্র, মিসির আলি, রূপা, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস, রাজনৈতিক উপন্যাস, ঐতিহাসিক উপন্যাস-বিচিত্র সৃষ্টিসম্ভারে তিনি আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ সুশোভিত করেছেন। তিনশতাধিক গ্রন্থের জনক এ মানুষটিকে বলা হয় বাংলা সায়েন্স ফিকশনের পথিকৃৎ। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক।
নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি অসম সমাদৃত। বাদ যায়নি গীতিকার কিংবা চিত্রশিল্পীর পরিচয়ও। সৃজনশীলতার প্রতিটি শাখায় তার সমান দক্ষতার বিচরণ ছিল। অর্জন করেছেন সর্বোচ্চ সফলতা এবং তুমুল জনপ্রিয়তা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাঙালি জাতিকে হুমায়ূন আহমেদ উপহার দিয়েছেন তার অসামান্য গল্প উপন্যাস, নাটক এবং চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের বদৌলতে মানুষকে করেছেন হলমুখী। হুমায়ূন আহমেদের কল্যাণে এদেশের প্রকাশনাশিল্প জেগে ওঠে, পাঠক তৈরিতে নতুন এক ইতিহাস রচনা করেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রতিটি নতুন বইয়ের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে পাঠক অধীর অপেক্ষায় থাকতেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি ক্রমাগত লিখে গেছেন, পাঠক-তৃষ্ণা মিটিয়েছেন।
ঘটনাপ্রধান, পরিবারভিত্তিক উপন্যাসগুলোতে হুমায়ূন আহমেদ আত্মকথন বা উত্তমপুরুষে বর্ণিত রীতিকে ব্যবহার করেছেন। যেমন নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, এইসব দিন রাত্রি, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই ইত্যাদি। চরিত্রকথনরীতির উপন্যাসগুলোতে তিনি সংলাপের মাধ্যমে যেমন চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলেন, তেমনি ঘটনাপ্রবাহকে এগিয়ে নিয়ে যান। চরিত্রের নাটকীয় বাঁক পরিবর্তন ও কাহিনির সফল পরিণতি দান করতে এ-পদ্ধতির জুড়ি মেলা ভার। মিসির আলি এবং হিমু চরিত্র সিরিজের উপন্যাসগুলোতে হুমায়ূন আহমেদ এ চরিত্র কথনরীতির সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। বর্ণনামূলক রীতির উপন্যাসেও হুমায়ূন আহমেদ অভিনবত্ব দেখিয়েছেন। বর্ণনার ধরাবাঁধা পথে তিনি হাঁটেননি। কাহিনি বর্ণনার প্রথাবদ্ধ পথে চলার বাধ্যবাধকতা না থাকায় পাঠক নিজের কল্পনাকে অবাধে মেশানোর সুযোগ পান বলে পাঠক নিজেই একাত্ম হয়ে ওঠেন। এ ধারার উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে জোছনা ও জননীর গল্প, বাদশা নামদার, দেয়াল, মধ্যাহ্ন ইত্যাদি। নাট্যগঠনরীতির উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ কথার পিঠে কথা সাজিয়ে সংলাপের পথ ধরে পৌঁছে যান চরিত্রের গভীরে। উঠে আসে আবেগ আর অনুভূতির চিরন্তন সত্যগুলো। মানবজীবনের চিরন্তন সুখ-দুঃখ, আলো-অন্ধকারে ঘেরা জীবনের আত্মোন্মোচন ঘটে এ পদ্ধতিতে। কথাসাহিত্যের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে চরিত্র সৃষ্টির ওপর। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বলতেই হয়, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে বেশকিছু অবিস্মরণীয় চরিত্র উপহার দিয়েছেন। হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, রূপা-কালজয়ী, প্রভাবসঞ্চারী অমর চরিত্র। তার উপন্যাসের আঙ্গিক-প্রকরণের নিরীক্ষাও কম নয়। যে আঙ্গিকেই তিনি সাহিত্য রচনা করেন না কেন, আগাগোড়াই তার সাহিত্য দ্যুতিময়। কোনো লেখকেরই সব রচনা সেরা হয় না, সমান মর্যাদা পায় না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের বৈশিষ্ট্য, তার সব ধরনের লেখার মধ্যে একটা সাধারণ মান বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছেন। এভাবে যুগের সব অভিজ্ঞানকে আত্মস্থ করে তিনি হয়ে ওঠেন সমকালের আশ্চর্য এক কথক। ফলে তার সৃষ্টিমালা এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়। তার লেখা উপন্যাস-সায়েন্স ফিকশন আজও বেস্ট সেলার।
২০১২ সালের ১৯ জুলাই ৬৩ বছর বয়সে নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর মাত্র কদিন পরই তার ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হবে। বর্ণাঢ্য জীবনের জননন্দিত সাহিত্য কর্তার বাহ্যিক মৃত্যু হলেও তিনি বেঁচে থাকবেন বহু যুগ শতাব্দী অমর সাহিত্যকীর্তির মাধ্যমে। একজন হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছেন। তার প্রতি জীবন-কর্ম, কাজের পরিবেশ, বাস্তুভিটা, রুচিবোধ এবং তার সময়কার সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গ্রহণে বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে কৌতূহল অনিঃশেষ। গুণী লেখক ও শিল্পীদের বাড়ি এবং স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণ করা একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাস ও সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীর বাড়ি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্মৃতিকেন্দ্র হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, আবার কিছু স্থান এখনো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিদের স্মৃতি সংরক্ষণে তাদের বাসস্থানগুলোকে প্রায়শই স্মৃতি জাদুঘর বা ‘হাউস মিউজিয়ামে’ রূপান্তর করা হয়। এ বাড়িগুলো শুধু ইতিহাসই ধরে রাখে না, বরং দর্শনার্থীদের সেসব মনীষীদের ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মক্ষেত্রের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়। সংরক্ষিত বাস্তুভিটাগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে, যা দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন খাতের উন্নয়ন ঘটায়। দীর্ঘদিন ধরে হুমায়ূন আহমেদের মুগ্ধ পাঠক, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি বোদ্ধা, সুধীজনরা দাবি করে আসছেন তার স্মৃতি সংরক্ষণের।
আমাদের দেশের বিখ্যাত-প্রখ্যাত শিল্পী সাহিত্যিক গুণিজনদের বাস্তুভিটা-বাড়ি-ঘর, স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। স্মৃতি জাদুঘর করতে হবে। দেশের প্রত্নতত্ত্ব আইন ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার আওতায় এনে তাদের স্থাপনা দখল বা ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাদের সৃষ্টিকর্ম, তাদের পাণ্ডুলিপি, তাদের বাড়িগুলোর স্থাপত্যশৈলী এবং ব্যবহৃত সামগ্রী থ্রিডি স্ক্যানিং ও ডিজিটাল ক্যাটালগের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে।
দেশের সর্বস্তরের মানুষ হুমায়ূন আহমেদের হাতে গড়া গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামের রূপকথার রাজ্য নুহাশ পল্লীর কথা, তার ধানমন্ডির দখিন হাওয়ার কথা জানেন। তার জনপ্রিয় বই ও নাটকের আবহ ও গল্পে এই পরিচিত ঠিকানা ঘুরেফিরে এসেছে। নুহাশ পল্লীতে বসে লিখেছেন উপন্যাস গল্প নাটক। এখানে তার অনেক নাটক এবং সিনেমার শুটিং হয়েছে। তার সময় যাপনের প্রিয় ঠিকানা ছিল নিজ ও প্রিয়তম সন্তান নুহাশ হুমায়ূনের নামে প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত ‘নুহাশ পল্লী’ হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে গড়া এক স্বপ্নভূমি ও প্রকৃতিপ্রেমের অনন্য নিদর্শন। প্রায় ৩০০ প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ, এখানে হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় বৃষ্টিবিলাস কটেজ, ট্রি-হাউস, সুইমিং পুল এবং তার সমাধি রয়েছে। নুহাশ পল্লীতে ঢুকলেই বাম দিকে চোখে পড়বে এক মনোরম সবুজ প্রান্তর। তারই পাশে লিচু বাগানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন হুমায়ূন আহমেদ।
তিনি প্রায়শই নুহাশ পল্লীতে চলে আসতেন সময় কাটাতে। কখনো আসতেন সপরিবারে, কখনো আসতেন বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে রাতভর আড্ডা দিতে। প্রতিবছর ১ বৈশাখে নুহাশ পল্লীতে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হতো। নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদ শুটিং স্পট, লীলাবতী দিঘি আর তিনটি সুদৃশ্য বাংলো গড়ে তুলেছেন। একটিতে তিনি থাকতেন আর বাকি দুটিতে তিনি তার শৈল্পিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। শানবাঁধানো ঘাটের দিঘির দিকে মুখ করে বানানো বাংলোকে তিনি ‘ভূত বিলাস’ নাম দিয়েছিলেন। দুর্লভ সব ঔষধি গাছ নিয়ে যে বাগান তৈরি করা হয়েছে তার পেছনেই রূপকথার মৎস্যকন্যা আর রাক্ষসের ভাস্কর্য রয়েছে। আরও রয়েছে পদ্মপুকুর ও অর্গানিক শৈলীতে নকশা করা এবড়োখেবড়ো সুইমিং পুল। ‘বৃষ্টি বিলাস’ বাংলোয় থাকতেন তিনি। একসময় এ বরেণ্য সাহিত্যিক তার অতিথিদের নুহাশ পল্লী ঘুরে দেখাতেন। বিভিন্ন গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল এ নুহাশ পল্লী।
তার মৃত্যুর পর নুহাশ পল্লীর দখল ও মালিকানা নিয়ে বিতর্ক ও বিরোধ চলে আসছে। লেখকের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারে প্রভাবে নুহাশ পল্লী করায়ত্ত করে বিনোদনকেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ করেছেন নুহাশের পরিবার।
সচেতন মহলের অনেকে মনে করেন, লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতি সংরক্ষণে তাদের বাড়ি বা আবাসস্থল সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে কবি-সাহিত্যিকদের স্মৃতিবিজড়িত অনেক ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে, যেগুলো তাদের সৃষ্টি ও জীবনকর্মের অমূল্য দলিল হিসাবে টিকে আছে। লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িঘর তাদের সৃষ্টি ও জীবনাদর্শের অনন্য দলিল। বাড়িগুলোকে জাদুঘর বা সাংস্কৃতিককেন্দ্রে রূপান্তর করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণ করা যায়। তবে বর্তমানে অনেক ঐতিহাসিক ভিটা, যেমন হুমায়ূন আহমেদ, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আবির্ভূত একজন প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক, তার স্মৃতিবিজড়িত নুহাশ পল্লী, অবহেলার শিকার হচ্ছে।
পৃথিবীর সেরা লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয় তাদের সৃষ্টিকর্ম, ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং বাসভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের মাধ্যমে। এছাড়া তাদের জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা, জীবনীগ্রন্থ রচনা এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তাদের অবিনশ্বর সৃষ্টি ও আদর্শ চিরকাল বাঁচিয়ে রাখা হয়। বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীদের শেষ জীবন বা কর্মজীবন কাটানো বাড়িগুলো সাধারণত জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। সাহিত্য-সংস্কৃতিকে অমরত্ব দান করতে হলে তাদের ভালোবাসতে হবে। অজানা বিস্মৃত অধ্যায় স্বজাতির সাহিত্য-সংস্কৃতির অতীত ইতিহাস উপলব্ধি করতে হবে। স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশে সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও বিভিন্ন ট্রাস্ট অনেক বাড়ি সংরক্ষণ করে থাকে। দেশবরেণ্য সাহিত্যিক কিংবদন্তি হুমায়ূন আহমেদের বাস্তুভিটা জাতির স্মৃতির বাতিঘর। নুহাশ পল্লী অধিগ্রহণ করে হুমায়ূন আহমেদ স্মৃতি জাদুঘর বা ‘হাউস মিউজিয়াম’ করা জরুরি। সেখানে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থাকবে, ক্রিয়েটিভ রাইটিং ইনস্টিটিউট থাকবে। একটা ট্রাস্টের অধীনে চলবে। হুমায়ূন আহমেদের পুত্র নুহাশকে ট্রাস্টি বোর্ডে রাখা যায়।
দেশ-বিদেশে এরকমটাই হয়ে আসছে। বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের জন্মভিটা ও জীবনের শেষ সময় কাটানোর বাড়িটি বর্তমানে অতি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এটি দেখার জন্য বিশ্বের পর্যটকরা ছুটে যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জীবনের শেষ ২২ বছর কাটানো বাড়িটি একটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থান। তলস্তয়ের এস্টেট ‘ইয়াসানায়া পলিয়ানা’ আজ রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক তীর্থস্থান। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের শেষ জীবনের বাড়িটি একটি জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে তার ব্যবহৃত বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্টের কোচ এবং বইয়ের সংগ্রহ সংরক্ষিত আছে। বিখ্যাত আমেরিকান লেখক নাথানিয়েল হথর্নের অনুপ্রেরণায় এ বাড়িটিকে পরবর্তী সময়ে জাদুঘর ও স্থানীয় অভিবাসীদের কল্যাণে সেটেলমেন্ট হাউস হিসাবে গড়ে তোলা হয়। নেলসন ম্যান্ডেলার ঐতিহাসিক বাড়িটি ‘ম্যান্ডেলা হাউস’ নামে পরিচিত। এটি একটি মিউজিয়াম হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও সংগ্রামময় জীবনের ইতিহাস প্রদর্শিত হয়। ফ্রান্সে ভিক্টর হুগোর বাড়ি বা পাবলো পিকাসোর মিউজিয়াম। এটি অনুরাগীদের তাদের কাজের পরিবেশ অনুভব করতে সাহায্য করে, তাদের অরিজিনাল পাণ্ডুলিপি, চিত্রকর্ম এবং দুর্লভ স্কেচগুলো ডিজিটাল আর্কাইভ ও আর্ট গ্যালারিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয় যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতি রক্ষার্থে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পদমদী গ্রামে এ স্মৃতিকেন্দ্র ও জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য ত্রিশালের দরিরামপুর এবং কাজীর শিমলা গ্রামের দারোগা বাড়িকে ‘নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র’ হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে কবির ব্যবহৃত ঐতিহাসিক খাট ও অন্যান্য জিনিসপত্র রয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ি এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর কাচারিবাড়ি দর্শনীয় স্থান হিসাবে সংরক্ষিত। শান্তিনিকেতনের আদি বাড়ি ও অন্যান্য বাসভবনও সুরক্ষায় রয়েছে। নোবেলজয়ী মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্প্যানিশ উপনিবেশ আমলের বাড়িটি এখন একটি জনপ্রিয় জাদুঘর, যেখানে তার লেখালেখির ঘর এবং বিড়ালদের বংশধরদের দেখা মেলে। বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামে ভাষাবিদ ও গবেষক ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়িটি জাদুঘর হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর মুন্সীগঞ্জের রাঢ়ীখালের পৈতৃক বাড়িটি বর্তমানে বিজ্ঞান কমপ্লেক্স ও জাদুঘর হিসাবে সংরক্ষিত। কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগড়দাঁড়িতে অবস্থিত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ‘মধুপল্লী’ হিসাবে রূপান্তর করে কবির স্মৃতিচিহ্ন ও জীবনালেখ্য সংরক্ষণ করছে। এটি একটি বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র এবং সেখানে তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাস ও সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীর বাড়ি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্মৃতিকেন্দ্র হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, আবার কিছু স্থান এখনো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত এক অনিন্দ্য সুন্দর নন্দন কানন গাজীপুরের নুহাশ পল্লী দ্রুত সংরক্ষণের বন্দোবস্ত করার দাবি উচ্চারিত হচ্ছে সর্বস্তর থেকে।
এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের অনেকেই বলেছেন এবং আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে, বরেণ্য লেখক হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে একজন মহিরুহ ব্যক্তিত্ব। হুমায়ূন আহমেদ পাঠকের মনোজগৎ বদলে দিয়েছেন। তরুণ সম্প্রদায়কে বইমুখী করার অভাবনীয় কীর্তি তার। চলচ্চিত্রের গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছে তার চলচ্চিত্র। হলমুখী করেছিল দর্শকদের। টেলিভিশনে তার নাটক পারিবারিক বিনোদনের নতুন অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। তার প্রতি মানুষের মুগ্ধতা ছিল। তার একটি অমর কীর্তি নুহাশ পল্লী। এ কারণে অনেকে হুমায়ূন আহমেদের এ নন্দন কাননকে জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে। তবে দাবি জানালেই তো হয় না, বাস্তবতা ও আইনগত বিষয় আছে। নুহাশ পল্লী হয়তো কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন বা পরিবারের মালিকানায় আছে, আমরা ঠিক জানি না। এটা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। আইনগত দিকগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণের অবকাশ রয়েছে। আমার মনে হয়, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি জাতীয়ভাবে সংরক্ষণের যৌক্তিকতা রয়েছে। এটি জনদাবি হলে সরকার খতিয়ে দেখবে।
আনোয়ারুল ইসলাম : সাংস্কৃতিক সংগঠক








