সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে নতুন করে সামনে এসেছে মরিয়ম খাতুন নামের এক তরুণীর বায়োডাটা। জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ভাইরাল ভিডিওতে থাকা নারী তার বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রী। একই দাবি করেছেন তার প্রথম স্ত্রী, ওই নারী এবং নারীর বাবাও।

তবে জাগো নিউজের হাতে আসা একটি বায়োডাটায় দেখা গেছে, কথিত বিয়ের পাঁচদিন পরও মরিয়ম খাতুনের বৈবাহিক অবস্থায় ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে। এ তথ্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সোমবার (২০ জুলাই) রাত থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ ভিডিওটিকে বাস্তব বলে দাবি করছেন, আবার কেউ বলছেন এটি সম্পাদিত বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা। তবে ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথমে গাজী নজরুল ইসলামের দলীয় মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। এরপর মঙ্গলবার (২১ জুলাই) এক লিখিত বিবৃতিতে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, চলতি বছরের ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়।

তিনি বলেন, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মাছুম বিল্লাহকে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে শ্বশুরের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে অবস্থানকালে তার গাড়িচালক এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে তাদের জিম্মি করেন। এসময় তাদের কাছ থেকে এক লাখ টাকা আদায় করা হয় এবং পরে আরও কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এমপির দাবি, দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মাছুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতার জের ধরে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত গোপনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ওই ভিডিওকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ওই নারী এমপি নজরুলের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’: ভিডিও বার্তায় প্রথম স্ত্রী

প্রথম স্ত্রীও বললেন ‘বিয়ে হয়েছে’

ভিডিওটি প্রকাশের পর এক ভিডিও বার্তায় গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম বলেন, মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে তার স্বামীর পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার চালানো হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করে দেন তিনি।

মরিয়মেরও একই দাবি

মরিয়ম খাতুনও পৃথক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, গাজী নজরুল ইসলাম তার স্বামী। সম্প্রতি প্রকাশিত ভিডিওটি ‌‘পরিকল্পিতভাবে’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তার স্বামীর সম্মানহানির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।

ওই নারী এমপি নজরুলের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’: ভিডিও বার্তায় প্রথম স্ত্রী

যা বলছেন মরিয়মের বাবা

মরিয়মের বাবা মাছুম বিল্লাহ বলেন, গত ১৭ জুন দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে তার মেয়ের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে এমপির প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।

সামনে এলো কাবিননামা

জাগো নিউজের হাতে আসা ওই বিয়ের একটি কাবিননামার অনুলিপিতে দেখা যায়, তিন লাখ টাকা দেনমোহরে গাজী নজরুল ইসলাম ও মরিয়ম খাতুনের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে মো. আবুল হোসেন ও বেগম মাকসুদা ইসলামের নাম রয়েছে। তবে কাবিননামাটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ওই নারী এমপি নজরুলের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’: ভিডিও বার্তায় প্রথম স্ত্রী

৫ দিন পরের বায়োডাটায় ‘অবিবাহিত’

তবে বিয়ের দাবির মধ্যেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে জাগো নিউজের হাতে আসা মরিয়ম খাতুনের একটি বায়োডাটা। সেখানে দেখা যায়, চলতি বছরের ২২ জুন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সই রয়েছে। সইয়ের ওপরে সবুজ কালিতে হাতে লেখা রয়েছে ‘জোর সুপারিশ করছি’। কিন্তু একই বায়োডাটার ব্যক্তিগত তথ্য অংশে Marital Status-এ লেখা রয়েছে ‘Unmarried’ (অবিবাহিত)।

গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী, মরিয়ম খাতুন এবং মরিয়মের বাবার বক্তব্য অনুযায়ী তাদের বিয়ে হয়েছে ১৭ জুন। অর্থাৎ বিয়ের দাবিকৃত তারিখের পাঁচ দিন পর এমপির সই করা বায়োডাটায় কেন মরিয়মকে অবিবাহিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলাম কিংবা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

তদন্তের দাবি

লিখিত বিবৃতিতে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, তাদের সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিক চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে জাগো নিউজের হাতে আসা কাবিননামা ও বায়োডাটার সত্যতাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আহসানুর রহমান/এসআর/জেআইএম