পেশি, চর্বি, পানি, হাড়, রক্ত ও মস্তিষ্কের সমন্বয়েই একজন ব্যক্তির সম্পূর্ণ ওজন। আর এই সবটা মিলে যখন উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি হয়ে পড়ে, তখন তার স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে। আর তাই সুস্থ থাকতে একজন ব্যক্তির সঠিক ওজন থাকা জরুরি।

ওজনে কার কত ভূমিকা

শরীরের ওজনের সবচেয়ে বড় অংশই পানি। সাধারণত পুরুষের দেহের ওজনের ৫৫-৬৫ এবং নারীর ৪৫-৬০ শতাংশ পানি থাকে। যাঁরা মোটামুটি সচল জীবনযাপন করেন, তাঁদের পেশির ওজন ৩০-৪০ শতাংশ থাকে।

নারীদের দেহে চর্বির পরিমাণ ১৮-৩০ শতাংশ, সেই তুলনায় পুরুষের দেহে চর্বি কিছুটা কম, ১০-২০ শতাংশ। প্রত্যেক মানুষের দেহস্থ কঙ্কালের ওজন ১০-১৫ ভাগ। একজন সুস্থ মানুষের শরীরে ৫-৬ লিটার রক্ত থাকে, যা সম্পূর্ণ দেহের ওজনের ৭-৮ শতাংশ। আমাদের শরীরের সম্পূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করা মস্তিষ্কটি দেহের মোট ওজনের ২ শতাংশ।

সুস্থ থাকতে একজন ব্যক্তির সঠিক খাদ্যাভাস জরুরি

একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক ব্যক্তির খাদ্যশক্তি শরীরে প্রধানত দুইভাবে খরচ হয়। দেহের সম্পূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল ও স্বাভাবিক পরিচালনার জন্য শক্তি প্রয়োজন পড়ে আর জীবনযাপন ও অ্যাকটিভিটিজেও শক্তি খরচ হয়। মানে ক্যালরি গ্রহণ এবং খরচের ওপর নির্ভর করে ওজনের ভারসাম্য। কোনো কারণে এর ব্যত্যয় ঘটলেই ওজন বাড়তে থাকে।

একজন ব্যক্তির হঠাৎ করে ওজন বাড়ে না। ক্যালরি গ্রহণ অনুযায়ী কম শারীরিক কার্যকলাপ, অপর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ ইত্যাদি কারণে ধীরে ধীরে ওজন বাড়ে। দেখা যায়, ইনসুলিনের প্রভাবে শক্তি সঞ্চয় হয়, ট্রাইগ্লিসারাইড হিসেবে কোষে জমে চর্বি।

এতে চর্বির কোষ যেমন বড় হয়, পাশাপাশি সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। মানে বিপাক, হরমোন, মস্তিষ্কের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ ও চর্বি টিস্যুর জটিল ক্রিয়ায় ওজন বাড়ে। ওজন বৃদ্ধি তাই শুধু খাদ্যগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল না। যে কারণে শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণেই যে ওজন কমবে, সেটা ঠিক না। ওজন কমাতে সম্পূর্ণ অবস্থা বুঝেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কোন ডায়েট এড়িয়ে চলবেন

সুস্থভাবে ওজন কমাতে কখনোই খুব কঠিন কিছু করার দরকার নেই। বিশেষ করে কিছু ডায়েট থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।

আমার পরামর্শ—

  • ক্র্যাশ ডায়েট করে ওজন কমাবেন না। সারা দিনে খুব কম খাদ্য গ্রহণে হয়তো দ্রুত ওজন কমে, কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক। পুষ্টির ঘাটতিতে দুর্বলতা, মাথা ঘোরাসহ হতে পারে পেশি ক্ষয়। ক্র্যাশ ডায়েটের পর স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরলেই আবার দ্রুত ওজন বেড়ে যায়।

  • একই ধরনের খাবারের মাধ্যমে ওজন কমানোর কথা চিন্তা করবেন না। একই গ্রুপের খাবার কখনো শরীরের সব রকম পুষ্টি সরবরাহ করে না। যেমন শুধু ফল, শুধু স্যুপ বা শুধু জুস খেয়ে ওজন কমাতে গেলে আপনার শরীরে বরং পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেবে।

মেডিটেরানিয়ান ডায়েটে কি ওজন কমে
  • শরীর ডিটক্সিফিকেশনের জন্য কিছুদিন ডিটক্স ওয়াটার খাওয়ার মাধ্যমে ওজন কমানোর পক্ষে কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ডিটক্স খেলে শরীরে প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হতে পারে। তবে শরীরের ওজনের ওপর ভিত্তি করে পানি পান করতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ওজনের জন্য ৩০-৩৫ মিলিলিটার পানি পান করুন।

  • খাদ্যের ৬টি উপাদান রয়েছে। প্রতিটিরই শরীরে ভিন্ন ভিন্ন কাজ আছে। ওজন কমাতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া কার্বোহাইড্রেট, ফল অথবা দুগ্ধজাত খাবার পুরোপুরি বাদ দিলে শরীরে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। সে জন্য এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস পরিহার করুন।

  • অতিরিক্ত প্রোটিনযুক্ত খাবার খেয়ে ওজন কমানোর চেষ্টা করবেন না। বিশেষ করে প্রাণিজ প্রোটিনে ফাইবার খুবই কম থাকে। প্রাণিজ প্রোটিন অতিরিক্ত খেলে এবং শাকসবজি, ফল ও ফাইবারযুক্ত খাবার না খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

  • স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেড়ে গিয়ে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে, কোলন ক্যানসারের আশঙ্কা বেড়ে যায়। অন্ত্রেও মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যেতে পারে।

মূলত ওজন কমানোর জন্য প্রয়োজন খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাপনের সামঞ্জস্য। অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো এবং সুষম খাদ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কাঁচা খাবার বা রান্না ছাড়া খাবার প্রাধান্য দেওয়া ভালো। স্বাস্থ্যকর জীবনধারণের জন্য নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, সঠিক মেটাবলিজম এবং চাপ কমাতে পর্যাপ্ত ঘুমানো অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: প্রধান পুষ্টিবিদ, ডায়েট কাউন্সেলিং সেন্টার, বাংলামোটর, ঢাকা

কোন ডায়েট আপনার উপযোগী, বুঝবেন কী করে?