পঞ্চগড় সদর উপজেলার শেখপাড়া গ্রামে বসেছিল শতবর্ষী ‘পাগলির মেলা’। খেলনা বাঁশির শব্দ, নাগরদোলা, মাটির তৈজসপত্র, চুড়ি-ফিতা, মুড়ি-মুড়কি ও গুড়ের জিলাপির দোকানে ক্রেতাদের ভিড়ে উৎসবমুখর ছিল মেলা প্রাঙ্গণ। গতকাল শনিবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পঞ্চগড়ে এভাবেই জমে উঠেছিল এক দিনের পাগলির মেলা।

প্রতিবছর মহররম মাসের ১১ তারিখে পঞ্চগড় সদর উপজেলার গরিনাবাড়ি ইউনিয়নের জনবসতিপূর্ণ শেখপাড়া গ্রামে কাঁচা সড়কের ওপর বসে শতবর্ষী এই মেলা। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

গতকাল শনিবার রাত আটটার দিকে পাগলির মেলায় গিয়ে স্থানীয় বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর আগে আমিরন নামের এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী ভারত সীমান্তঘেঁষা শেখপাড়া গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। ঘন গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে ঘেরা গ্রামটিতে তিনি একা, নীরবে-নিভৃতে থাকতেন। তবে আশুরার সময় তিনি মানুষের মাঝে এসে মহররম ও আশুরা নিয়ে গীত শোনাতেন। স্থানীয় লোকজনও মনোযোগ দিয়ে তাঁর সেই গীত শুনতেন। একদিন হঠাৎ আমিরনের মৃত্যু হলে স্থানীয় লোকজন তাঁকে গ্রামের সড়কের পাশে সমাহিত করেন। পরে প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে স্থানীয় লোকজন কবরের পাশে দোয়া ও ফাতেহা পাঠ করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেটিই রীতিতে পরিণত হয়। একসময় আমিরনের কবর ‘পাগলির মাজার’ নামে পরিচিতি পায়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ১১ মহররম বসতে শুরু করে ‘পাগলির মেলা’।

মেলায় মুড়ি-মুড়কি বিক্রি করতে আসা অলিম পাল (৪৬) বলেন, ‘প্রতিবছর মহররম মাসের ১১ তারিখে আমরা এই মেলায় দোকান নিয়ে আসি। বহু বছর থেকে এই মেলা হয়। যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার বাবা এখানে মেলার দিনে দোকান নিয়ে আসতেন। তখন বাবার সঙ্গে আমিও আসতাম। ঠিক কত দিন থেকে এই মেলা হচ্ছে জানি না। তবে শুনেছি, এখানে আমার দাদাও মুড়ি–মুড়কির দোকান নিয়ে এসেছিলেন।’

শেখপাড়া গ্রামে জমে উঠেছিল এক দিনের পাগলির মেলা

রবিউল ইসলাম (৩৮) নামের এক ব্যক্তি বলেন, পাগলির মেলা উপলক্ষে পুরো গ্রামে উৎসবের আমেজ থাকে। প্রতিটি বাড়িতে ভালো রান্না হয়। প্রায় সবারই মেয়ে-জামাতাসহ অন্য আত্মীয়স্বজন আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম (৫০) বলেন, ‘মেলাটা মূলত আমাদের বাড়ির সামনেই হয়। এ জন্য একটু দেখাশোনা করতে হয়। এই মেলা পরিচালনার কোনো কমিটি নেই। প্রতিবছর ১১ মহররমের দিনে দোকানদার আর দর্শনার্থীরা এমনিতেই ভিড় শুরু করেন। কেউ কেউ পাগলির মাজার জিয়ারত করে দোয়া করেন। আমি যেমন ছোটবেলা থেকে এ রকম মেলা লাগতে দেখছি, আমার বাবাও নাকি এভাবেই দেখেছেন। তবে শুনেছি, আমাদের দাদারা নাকি ওই পাগলির বিষয়ে জানতেন।’