ইংল্যান্ড বনাম মেক্সিকো ম্যাচের আগে ফুটবলপাড়ার বড় বড় বোদ্ধারা যখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করছিলেন, তখন একটা বড় অংশের সুর ছিল মেক্সিকোর পক্ষে। অনেকেই বুক ফুলিয়ে বলছিলেন যে এই মেক্সিকো অনেক শক্তিশালী, তাদের ইস্পাতকঠিন রক্ষণ আর আগ্রাসী ফুটবলের সামনে তারকাবহুল ইংল্যান্ড হয়তো স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। বোদ্ধাদের এই আশঙ্কার পেছনে যুক্তিও ছিল অকাট্য।

প্রথমত, এই বিশ্বকাপের নকআউট বা রাউন্ড অফ ১৬ এ পা রাখার আগে পর্যন্ত মেক্সিকো প্রতিপক্ষের জন্য একটা দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পুরো গ্রুপ পর্বে তারা একটি গোলও হজম করেনি। তাদের ডিফেন্স লাইনের এই অতিমানবীয় পারফর্ম্যান্স যেকোনো আক্রমণভাগের মনে ভয় ধরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। দ্বিতীয়ত, মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের চেনা কন্ডিশন আর হোম গ্রাউন্ড সুবিধা। মেক্সিকোর বিখ্যাত, ইতিহাস জড়ানো এবং ফুটবলীয় ঐতিহ্যে ঠাসা স্টেডিয়ামে খেলা, যেখানে গ্যালারি ভরা উন্মাতাল মেক্সিকান সমর্থকরা তাদের প্রিয় দলের জন্য দ্বাদশ খেলোয়াড় হয়ে গলা ফাটাচ্ছিল।

এসবের সাথে যুক্ত হয়েছিল মেক্সিকোর ভৌগোলিক উচ্চতা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত এই চেনা কন্ডিশনে যেখানে মেক্সিকানরা অনায়াসে শ্বাস নিতে পারে, সেখানে ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের জন্য এই উচ্চতা ও দম ধরে রাখাটা একটা বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত।

কিন্তু ফুটবলাররা তো আর কাগজে কলমের কিংবা গ্যালারির সমীকরণে ম্যাচ জেতেন না। ম্যাচ শুরু হতেই মাঠের চেনা দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করল। বেলিংহামের ২ মিনিটের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড মেক্সিকান শিবির। অবশ্য, হল ছাড়েনি স্বাগতিকরাও। বিরতির আগেই ১ গোল শোধ করে লড়াইয়ে ফেরে তারা। 

ম্যাচের গতি যখন তীব্র, ঠিক তখনই ইংল্যান্ড শিবিরে নেমে আসে এক চরম বিপর্যয়। মাঠের উত্তেজনার পারদ সামলাতে না পেরে ইংল্যান্ডের রাইট-ব্যাক কুয়ানসা লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। ফলে খেলা শেষের অনেক আগেই ইংল্যান্ড পরিণত হয় ১০ জনের দলে। এরপর ৯ মিনিটের ব্যবধানে ২ দলের পেনাল্টি থেকে দুই গোল। স্কোরলাইন ৩-২। 

এমনিতেই প্রতিপক্ষের মাঠ, তার ওপর মেক্সিকান দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকার এবং ভৌগোলিক উচ্চতার কারণে এমনিতেই ফুটবলাররা হাঁপিয়ে উঠছিলেন। এই পরিস্থিতিতে ১০ জন নিয়ে মেক্সিকোর মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করাটা ছিল প্রায় অসম্ভব এক মিশন। গ্যালারিতে তখন মেক্সিকানদের সাপোর্ট, আর ডাগআউটে ইংল্যান্ড শিবিরের কপালে চিন্তার ভাঁজ।

ঠিক এই জায়গাটাতেই ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা নিজেদের ফুটবলীয় চরিত্রের আসল পরীক্ষাটা দিলেন। একজন কম নিয়েও তারা মাঠের নিয়ন্ত্রণ হারাল না। প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করল। ম্যাচের প্রতিটা সেকেন্ডে স্নায়ুচাপ যখন আকাশচুম্বী, তখন মাথা ঠাণ্ডা রেখে লড়াই চালিয়ে গেল থ্রি লায়ন্সরা। শেষ পর্যন্ত তীব্র উত্তেজনা আর নাটকীয়তায় ভরা ম্যাচটিতে ইংল্যান্ড ৩-২  ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয়। 

এই জয় শুধু একটা ম্যাচের জয় ছিল না, এটা ছিল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক মহাকাব্যিক জয়। বোদ্ধাদের সব থিওরি, মেক্সিকোর গোল না খাওয়ার রেকর্ড, গ্যালারির বৈরী পরিবেশ আর লাল কার্ডের ধাক্কা সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইংল্যান্ড প্রমাণ করল যে এই স্কোয়াডটা শুধু কাগজে কলমেই শক্তিশালী না, তারা মাঠের লড়াইয়েও আসলে অনেক বড় মানসিকতার পরিচয় দিতে পারে।