চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার প্লাবিত

টানা চার দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের ১৩টি উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী কক্সবাজার ও পার্বত্য বান্দরবানের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, সড়ক তলিয়ে যাওয়া, পাহাড়ধস ও গাছ উপড়ে পড়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় ওই রুটে ট্রেন চলাচলও বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় সংবাদকর্মী ও প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ, রাউজান, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বোয়ালখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক সড়ক ডুবে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বহু পরিবার পানিবন্দি থাকায় রান্নাবান্না বন্ধ রয়েছে এবং অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

উজানের পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু, ডলু ও টঙ্কাবতী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও কোথাও পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। সাতকানিয়ার ধর্মপুর, বাজালিয়া ও চরতী এবং লোহাগাড়ার আমিরাবাদ, বড়হাতিয়া, পুটিবিলা ও আধুনগর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কৃষিজমি, মাছের ঘের ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

লোহাগাড়ার আধুনগর এলাকায় ডলু নদীর সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে মহাসড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের একাধিক স্থানে সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালীর পুঁইছড়ি, শেখেরখীল, ছনুয়া, গন্ডামারা, চাম্বল, শীলকূপ, সরল, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, পুকুরিয়া ও সাধনপুর এলাকাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সমুদ্রের জোয়ারের লোনা পানি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের অন্তত তিনটি গ্রামের শতাধিক পরিবারের ঘরে পানি ঢুকেছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি সড়ক ধসে পড়েছে। পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সড়ক ও বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় হাজারো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।

রাউজান, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হাটহাজারীতে চট্টগ্রাম-নাজিরহাট সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে। রাউজানে ১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে একটি কালভার্ট বিচ্ছিন্ন হয়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলায় দুই দফা পাহাড়ধসে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে।

ফটিকছড়িতে হালদা নদী, ধুরুং খাল ও অন্যান্য জলাধারের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও পটিয়ায় জনদুর্ভোগ

চন্দনাইশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। শঙ্খ নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় বন্যার শঙ্কা বাড়ছে।

আনোয়ারার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে গেছে। বহু বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। সোমবার গভীর রাত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় লক্ষাধিক গ্রাহক দুর্ভোগে রয়েছেন।

পটিয়ার কুসুমপুরা, জিরি, কোলাগাঁও, হাবিলাসদ্বীপ, বড়লিয়া, জঙ্গলখাইন, আশিয়া, কাশিয়াইশ, ছনহরা ও ভাটিখাইন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কৃষিজমি, বীজতলা ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বোয়ালখালীতেও বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সন্দ্বীপ, যেখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। এছাড়া বাঁশখালীতে সাড়ে ৬ হাজার, আনোয়ারায় ২ হাজার ২০০, কর্ণফুলীতে ৩০০ এবং রাঙ্গুনিয়ায় ৩০০ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। জেলায় ৫৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনা খাবার ও জরুরি সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রয়েছে।

কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার অন্তত ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অন্তত ১১টি গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিজমি, সবজিখেত ও বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পার্বত্য জেলা বান্দরবানে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে আলীকদম, থানচি ও রোয়াংছড়ির সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

জেলা শহর ও লামার নিম্নাঞ্চল ডুবে যাওয়ায় বহু পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। আলীকদম ও থানচিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বান্দরবান-থানচি ও বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের একাধিক অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। রুমায় একটি সেতু পানিতে ডুবে গেছে এবং রুমা-বগালেক-কেওক্রাডং সড়কের পেপেঁবাগান এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।