পারমাণবিক অস্ত্র নীতিতে এবার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে ভারত। প্রথমবারের মতো তারা পৃথক স্থানে ১২টি পারমাণবিক অস্ত্র (নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড) মোতায়েন করেছে। গতকাল শনিবার স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা এসআইপিআরআইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে রুশ টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আরটি ইন্টারন্যাশনাল এ খবর জানায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শান্তি ও স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ভারত দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্র এবং সেগুলোর বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্যান্য ডেলিভারি সিস্টেম আলাদা করে সংরক্ষণ করত। এবারই প্রথম দেশটি তাদের পরমাণু অস্ত্রভান্ডারের একটি অংশকে ‘মোতায়েনকৃত’ বা অপারেশনাল হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এগুলো আগে কেবল মজুত অবস্থায় ছিল বলে বিবেচিত হতো। ভারতের সেনাবাহিনী বা এসআইপিআরআই বলছে, ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো এবং নতুন পারমাণবিক সাবমেরিনে দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের মাধ্যমে ভারত তার প্রস্তুতির মাত্রা বাড়িয়েছে। রুশ গণমাধ্যমটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার প্রায় ১৯০টিতে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য বেশি। এসব অস্ত্র বিমান, স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন নিয়ে গঠিত ভারতের ক্রমবর্ধমান ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’-এর অংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের এ পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে জটিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ। একদিকে দ্রুত পারমাণবিক শক্তি বাড়াচ্ছে চীন, অন্যদিকে পাকিস্তানও তার ‘ফুল-স্পেকট্রাম ডিটারেন্স’ নীতির আওতায় পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে। তবে ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তার ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতি বজায় রেখেছে। এ নীতির আওতায় দেশটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কোনো সংঘাতে প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। শুধু ভারতের ভূখণ্ড বা বিশ্বের যে কোনো স্থানে অবস্থানরত ভারতীয় বাহিনীর ওপর পারমাণবিক হামলা হলে তার জবাব হিসাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হবে।
চীনের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি : এসআইপিআরআইর হিসাব অনুযায়ী, চীনের হাতে বর্তমানে ৬২০টিরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যা তাকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বর্তমানে দ্রুত আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ঐতিহাসিক ন্যূনতম প্রতিরোধক্ষমতা নীতি থেকে একটি শক্তিশালী পারমাণবিক ত্রয়ী গঠনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের কাছে যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার সমানসংখ্যক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে।
পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি : প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের হাতে আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যা দেশটিকে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি মূলত ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রতিক্রিয়া হিসাবে গড়ে ওঠে। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার স্থল, আকাশ ও সমুদ্র-এ তিনটি ক্ষেত্রজুড়ে মোতায়েন রয়েছে। স্থলভিত্তিক সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যার মধ্যে শাহিন-৩ অন্যতম। এর সর্বোচ্চ পাল্লা ২ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার। আকাশপথে পারমাণবিক অস্ত্র বহনের জন্য এফ-১৬ ও মিরাজ ৩-৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সমুদ্রে আঘাত হানতে সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র (এসএলসিএম) উন্নয়নের কাজ চলছে। দেশটির পারমাণবিক ওয়ারহেডগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।
ভারতের পারমাণবিক ত্রয়ী : ভারতের পারমাণবিক ত্রয়ী হলো এমন একটি তিনমুখী সামরিক কাঠামো, যার মাধ্যমে দেশটি স্থল, আকাশ ও সমুদ্র-তিনটি মাধ্যম থেকেই পারমাণবিক হামলা চালাতে সক্ষম। ২০১৮ সাল থেকে এ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে দেশটিতে। ভারতের কৌশলগত প্রতিরোধব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অগ্নি সিরিজের ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। অগ্নি-৫ একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা ৫ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি এবং যা এশিয়া ও ইউরোপের গভীর অঞ্চলে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ভারতের আকাশভিত্তিক পারমাণবিক সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে, ফরাসি নির্মিত দ্বি-ইঞ্জিনবিশিষ্ট বহুমুখী রাফাল যুদ্ধবিমান, যা পারমাণবিক গ্র্যাভিটি বোমা অথবা স্ট্যান্ড-অফ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। এছাড়া মিরাজ ২০০০ এবং জাগুয়ার সুপারসনিক যুদ্ধবিমান দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্র বহনের জন্য বেশ উপযোগী। পারমাণবিক ত্রয়ীর সবচেয়ে নিরাপদ ও গোপনীয় অংশ হলো সমুদ্রভিত্তিক সক্ষমতা, যা নিশ্চিত করে যে শত্রুর হামলায় যদি স্থল ও আকাশঘাঁটি ধ্বংসও হয়ে যায়, তবুও ভারত কার্যকর দ্বিতীয় প্রতিশোধমূলক আঘাত হানতে পারবে।






