ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে রাজনীতির মাঠে বড় চমক ছিল বেশ কয়েকজন ‘হেভিওয়েট’ নেতার বিএনপিতে যোগদান। কেউ ছিলেন নিজ দলের প্রধান, কেউ দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা, আবার কেউ বা ছিলেন দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বর্ষীয়ান ব্যক্তিত্ব। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় থাকা এই নেতারা ধানের শীষ মার্কায় নির্বাচন করতে নিজ দল বিলুপ্ত করে কিংবা পদত্যাগ করে নাম লেখান বিএনপিতে। উদ্দেশ্য ছিল-‘সহজেই’ নির্বাচনি বৈতরণি পার হওয়া এবং রাজপথে ত্যাগের মূল্যায়ন পাওয়া।
তবে নির্বাচন-পরবর্তী তাদের অনেকেই এখন এক ধরনের ‘পরিচয় সংকটে’ ভুগছেন। কেউ কেউ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হলেও মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি, আবার কেউ প্রতিমন্ত্রী হয়েও পাননি দলীয় কোনো পদ। অন্যদিকে যারা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, তারা এখন তাকিয়ে আছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে দলটির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা বলছেন নেতারা। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, ৫ মাসের বেশি সময় ধরে বিএনপিতে আছেন। সাধারণ সদস্য হওয়ায় এলাকায় গুরুত্ব পাচ্ছেন না তারা। এমনকি স্থানীয় বিএনপির সঙ্গেও তাদের এক ধরনের বৈরিতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপিতে বড় পদের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্ব চান তারা। আবার দু-একজনের প্রত্যাশা, বিএনপি হাইকমান্ড ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুবিধামতো সময়ে তাদের মূল্যায়ন করবেন।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকা ২ জন সদস্য যুগান্তরকে জানান, নতুন যোগদানকারীদের বিষয়ে দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আছে। সময়মতো সবাইকে মূল্যায়ন করা হবে। আগামীতে দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমেই এই নেতাদের স্থায়ী পদ-পদবি ও রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করা হবে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তার আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রাথমিক সদস্য ফরম পূরণ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন ৮ জন নেতা। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন সাতজন। তারা হলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সাবেক মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমদ, গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া, বাংলাদেশ এলডিপির সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, এনডিএম’র সাবেক চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, এনপিপি’র চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। এছাড়া সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক আবু সাইয়িদ নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিলেও নির্বাচনে অংশ নেননি।
বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করা ৭ জনের মধ্যে ৩ জন সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া বিভিন্ন দল ঘুরে বিএনপিতে যোগ দিয়েই হবিগঞ্জ-১ থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। ববি হাজ্জাজ ঢাকা-১৩ আসন ও শাহাদাত হোসেন সেলিম লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ববি হাজ্জাজ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ড. রেদোয়ান আহমদ, সৈয়দ এহসানুল হুদা, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ এবং রাশেদ খান ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করলেও জয়ের মুখ দেখতে পারেননি।
এদিকে যোগ দেওয়া নেতাদের মধ্যে অনেকেই নিজ দলের রাজনীতি বিএনপির সঙ্গে বিলীন করে দিয়েছেন এমন আলোচনা আছে রাজনৈতিক মহলে। কারণ তাদের বর্তমান পরিচয় বিএনপির সাধারণ সদস্য। এ নিয়ে তাদের অনুসারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলেছেন, দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিলে তাদের নেতাকর্মীরাও বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন এমনটা ধরে নিতে হবে। কিন্তু গত কয়েক মাসে ওই নেতাকর্মীরা বিএনপি বা সরকারে তেমন কোনো গুরুত্ব পাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যোগদানকারী দলের একজন সংসদ-সদস্য বলেন, তিনজন ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হলেও একজন প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। অন্য দুজনও সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়ার প্রত্যাশা করেন। তার মতে, সংসদ-সদস্যের পাশাপাশি দলীয় পদ-পদবি থাকলে এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে। শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে থাকার আগ্রহ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, রাজনীতি করার জন্যই একটা রাজনৈতিক পরিচয় প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সৈয়দ এহসানুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, আমরা যারা যুগপৎ আন্দোলনে ছিলাম, পরে আমাদের দল বিলুপ্ত করতে হয়েছে মূলত কিছু কৌশলগত কারণে। বিশেষ করে আরপিও’র বিভিন্ন ধারা পরিবর্তনের ফলে আমাদের দল বিলুপ্ত করে নির্বাচনে অংশ নিতে হয়েছিল। তবে বিএনপিও আমাদের সেখানে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করেছে। তিনি বলেন, আমি বিএনপিতে আছি এবং শেষদিন পর্যন্ত থাকব। আশা করি, দল খুব শিগগিরই আমাদের একটি রাজনৈতিক পরিচয় দেবে।
রাশেদ খান যুগান্তরকে বলেন, ২০২২ সাল থেকে যখন বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন শুরু হয়, সেই সময় থেকেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সুসম্পর্কের সুবাদে আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিএনপির নেতৃত্বে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। আমরা যেহেতু আন্দোলন-সংগ্রাম করে এসেছি এবং গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছি, তাই আমি আশাবাদী যে বিএনপি অবশ্যই আমাদের মতো যারা আছে, তাদের মূল্যায়ন করবে।








