ইউরোপের মানচিত্রে ফ্রান্স এখন শুধু শিল্প-সংস্কৃতি, আইফেল টাওয়ার বা পর্যটনের দেশ নয়; এটি হাজারো বাংলাদেশি তরুণের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা। কিন্তু এ স্বপ্নের দুটি মুখ আছে। একদিকে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, সামাজিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার, দক্ষতার মূল্যায়ন এবং সম্মানজনক জীবন গড়ার সুযোগ; অন্যদিকে কঠোর অভিবাসন আইন, ভাষাগত চ্যালেঞ্জ, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি এবং কিছু বাংলাদেশির অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে কমিউনিটির সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা। ফলে ফ্রান্সে অভিবাসনের প্রশ্নটি শুধু বিদেশে যাওয়ার বিষয় নয়; এটি আইন, দক্ষতা, সততা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির একটি পরীক্ষা।
ফ্রান্স বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি। শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ, ফ্যাশন, কৃষি ও প্রযুক্তিতে দেশটির অবস্থান বিশ্বে শীর্ষ সারিতে। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সে যান। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুলনামূলক কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলার পরিবেশ ফ্রান্সকে তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় প্রথমে কিছুটা বেশি মনে হলেও এটি একটি বিনিয়োগ। প্যারিসে একজন শিক্ষার্থীর মাসিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা হতে পারে। তবে বৈধভাবে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নিজের ব্যয়ের একটি অংশ বহন করতে সক্ষম হন। পড়াশোনা শেষ করে দক্ষতা ও আইনি শর্ত পূরণ করে চাকরি পেলে মাসিক আয় বাংলাদেশি মুদ্রায় কয়েক লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে। ফলে ফ্রান্সে যাওয়া মানে শুধু বিদেশে যাওয়া নয়; নিজের মেধা ও ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ করা।
তবে বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সে যাওয়ার বাস্তবতা সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বৈধ পথ দুটি-উচ্চশিক্ষা এবং পারিবারিক পুনর্মিলন। ফরাসি আইনে কর্মভিসার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশ থেকে সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য কোনো উন্মুক্ত শ্রম অভিবাসন কর্মসূচি চালু নেই। অর্থাৎ কোনো ফরাসি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট চাকরির প্রস্তাব ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া সরাসরি কর্মভিসা পাওয়ার সুযোগ বাস্তবে খুবই সীমিত।
এ বাস্তবতা না জেনে অনেক তরুণ দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হন। কেউ পর্যটক ভিসায় গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যান, কেউ আবার অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। অথচ অনিয়মিত অভিবাসনের অর্থ হলো আইনি অনিশ্চয়তা, শ্রমশোষণ, কম মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং সব সময় বহিষ্কারের ঝুঁকি নিয়ে জীবন কাটানো। সাময়িকভাবে ইউরোপে পৌঁছানোকে সাফল্য মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই পথ ব্যক্তি, পরিবার এবং দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটির সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখা। কয়েক দশক ধরে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা কঠোর পরিশ্রম, সততা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন, তা বাংলাদেশের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদক পাচার, জাল কাগজপত্র, আর্থিক অপরাধ কিংবা অনিয়মিত অভিবাসনের সঙ্গে অল্পসংখ্যক বাংলাদেশির সম্পৃক্ততার অভিযোগ সেই অর্জনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সংখ্যাটি কম হলেও এর প্রতিক্রিয়া অনেক বড়। কারণ বিদেশে একজনের অপরাধ প্রায়ই পুরো কমিউনিটির পরিচয়ে পরিণত হয়।
তবে এ ছবির উলটো দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফ্রান্সে বসবাসরত অধিকাংশ বাংলাদেশি আইন মেনে চলেন, কঠোর পরিশ্রম করেন এবং সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করেন। তারা রেস্টুরেন্ট, ক্ষুদ্র ব্যবসা, নির্মাণ, পরিবহণ ও সেবা খাতের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং স্বাস্থ্যসেবায়ও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। অনেক বাংলাদেশি উদ্যোক্তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, নিয়মিত কর দিচ্ছেন এবং বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরছেন। তাদের অবদানই প্রমাণ করে যে দক্ষতা, সততা এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতেও সম্মান অর্জন করা সম্ভব।
ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো এখানে সংক্ষিপ্ত পথের কোনো মূল্য নেই। ভাষা জানতেই হবে, আইন মানতেই হবে, কর দিতেই হবে এবং সমাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতেই হবে। ফরাসি ভাষায় দক্ষতা শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য নয়; সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, প্রশাসনিক সেবা এবং পেশাগত উন্নতির জন্যও অপরিহার্য। যে বাংলাদেশিরা দেশে থাকতেই ভাষা শেখেন, দক্ষতা অর্জন করেন এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে ফ্রান্সে যান, তারাই তুলনামূলকভাবে দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন।
বাংলাদেশ সরকারেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফরাসি ভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাস ও প্রবাসী সংগঠনগুলোর উচিত নতুন শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের আইনি পরামর্শ, প্রশাসনিক সহায়তা এবং সামাজিক সংযোগ তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
আজ ফ্রান্স বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি অভিবাসন গন্তব্য নয়; এটি জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি বাংলাদেশিকে ফ্রান্সে পাঠানো নয়; বরং এমন বাংলাদেশি তৈরি করা, যারা দক্ষ, শিক্ষিত, আইন মেনে চলেন এবং নিজেদের আচরণের মাধ্যমে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
ফ্রান্সে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ভিসার সংখ্যার ওপর নয়; নির্ভর করবে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সততা, দক্ষতা, শিক্ষা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর। কারণ বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি শুধু নিজের পরিচয় বহন করেন না তিনি বহন করেন একটি পতাকার সম্মান, একটি দেশের মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা। তাই ফ্রান্সে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ভিসা কাগজে নয় যোগ্যতায়; আর সবচেয়ে বড় পরিচয় পাসপোর্টে নয় চরিত্রে।
হাসান ইলিয়াছ তানিম : সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী








