ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর সামরিক সরকার। ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে বুরকিনা ফাসোতে দেশটির স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে জান্তা সরকার। 

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বুরকিনা ফাসো সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করছে যে, আজ ২৬ জুন ২০২৬ থেকে ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।

তবে, এই সিদ্ধান্ত কেবল দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর ফলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।

ক্যাপ্টেন ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার অভিযোগ করে, ফ্রান্স এখনও ‘নব্য-ঔপনিবেশিক’ আকাঙ্ক্ষা লালন করছে। তাদের দাবি, বুরকিনা ফাসোতে সরকারবিরোধী নেটওয়ার্ক এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দিচ্ছে প্যারিস সরকার। এতে বুরকিনা ফাসো ও সাহেল অঞ্চলে সহিংসতা ও অস্থিরতা বাড়ছে।

এর জবাবে জান্তা সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘শত্রুতাপূর্ণ ও ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছে ফ্রান্স। প্যারিসের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ বুরকিনা ফাসো কর্তৃপক্ষের ‘উদ্বেগজনক অবস্থান’ তুলে ধরেছে। এমন সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় পাল্টা ব্যবস্থা বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইকোয়াস থেকে সাহেল এক্সিট

ফ্রান্সের নেতৃত্বে পশ্চিম আফ্রিকার ১৫ টি রাষ্ট্র নিয়ে ১৯৭৫ সালে গঠিত হয় পশ্চিম আফ্রিকান দেশসমূহের অর্থনৈতিক সমাজ (Economic Community of West African States) যা সংক্ষেপে ইকোয়াস (ECOWAS)। ১৯৭৭ সালে ১৬তম সদস্য হিসেবে ইকোয়াসে যুক্ত হয় কেপ ভার্দে। ২০০০ সালে মৌরিতানিয়া ইকোয়াস ত্যাগ করলে এর সদস্য সংখ্যা আবার ১৫ টিতে দাঁড়ায়। তবে, বর্তমানে এর সদস্য দেশ ১২টি।

সাহেল এক্সিট

বুরকিনা ফাসো, মালি এবং নাইজার-এর একযোগে Economic Community of West African States (ইকোয়াস) ত্যাগ করা বুঝাতে সাহেল এক্সিট (Sahel Exit) শব্দদ্বয় ব্যবহৃত হয়। এই তিন দেশের সামরিক সরকার ২০২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করে Alliance of Sahel States (AES)। এর পেছনে মালি (২০২১), বুরকিনা ফাসো (২০২২) এবং নাইজার-এ (২০২৩) সামরিক অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা দায়ী করা হয়। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ব্যর্থতা এবং বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের বিরোধিতা থেকেই ইকোয়াস থেকে বেরিয়ে যায় বুরকিনা ফাসো, মালি এবং নাইজার।

ইকোয়াস এই দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও বেসামরিক শাসনে ফেরার চাপ সৃষ্টি করলে ২০২৪ সালে ইকোওয়াস ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এক বছরের নোটিশ শেষে ২০২৫ সালে তাদের সদস্যপদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়।

আরও পড়ুন>>
মালিতে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ফরাসি কর্মকর্তার ২০ বছর জেল

উল্লেখ্য, ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা অর্জনের আগ পর্যন্ত বুরকিনা ফাসো ফরাসি উপনিবেশ ছিল। ফরাসি শাসনামলে দেশটির নাম ছিল ফরাসি আপার ভোল্টা (French Upper Volta)। ১৯৮৫ সালে দেশটির নাম বদলে রাখা হয় বুর্কিনা ফাসো, যার অর্থ ‘নৈতিক জাতির দেশ’।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর ফ্রান্সের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছে ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরের সরকার। একই সময়ে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক জোরদার হওয়ায় মহাদেশটিতে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়ে উঠেছে।

সূত্র: আফ্রিকান নিউজ
কেএম