একসময় ফুটবলে কোচের চোখই ছিল সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি। একজন সহকারী কোচের লেখা কয়েকটি নোটই ছিল পুরো ম্যাচ বিশ্লেষণের ভরসা। সেই ফুটবল আর নেই। এখন লড়াই করে কম্পিউটার, ডেটা, জিপিএস ট্র্যাকার, ভিডিও অ্যানালিস্ট, স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট আর পারফরম্যান্স বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বকাপ ফুটবল প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার। ভিডিও বিশ্লেষক, ডেটা বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ, ফিটনেস কোচ, ঘুম বিশেষজ্ঞ, ফিজিওথেরাপিস্ট, মনোবিজ্ঞানী, বায়োমেকানিক্স গবেষক-সবাই মিলে তৈরি করেন একটি দল।
একসময় কোচ বলতেন, ‘ওদের ডান দিক দিয়ে আক্রমণ করো।’ এখন কোচের ট্যাবলেটে ভেসে ওঠে প্রতিপক্ষের ডান ফুল-ব্যাক ৭০ মিনিটের পর গতি হারিয়ে ফেলেন, বাঁ দিকের সেন্টার-ব্যাক চাপের মুখে ভুল পাস দেন। একসময় ম্যাচের ভিডিও দেখা হতো খেলা শেষ হওয়ার কয়েকদিন পর। এখন বিরতির ১৫ মিনিটেই প্রথমার্ধের ভুল, সুযোগ, দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরা হয়। আধুনিক ফুটবলে ড্রেসিংরুমও একটি ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ।
ফুটবল এখন একসঙ্গে বিজ্ঞান, শিল্প আর মনোবিজ্ঞানের সমন্বয়। অনুশীলনের সময় খেলোয়াড়দের গায়ে লাগানো ছোট্ট একটি জিপিএস ডিভাইস বলে দেয়-তিনি কত কিলোমিটার দৌড়ালেন, কতবার স্প্রিন্ট করলেন, কোন গতিতে দৌড়েছেন, হৃৎস্পন্দন কত ছিল, শরীরের ওপর কতটা চাপ পড়েছে। বিশ্বকাপে কম্পিউটার হয়ে উঠেছে নীরব সহকারী কোচ। ভিডিও অ্যানালিস্টদের মূল্য এখন অনেক সময় একজন সহকারী কোচের সমান। প্রতিপক্ষের কর্নার, ফ্রিকিক, থ্রো-ইন, বিল্ডআপ সব কিছু খুঁটিয়ে দেখা হয়। অনেক গোলের সূচনা হয় মাঠে নয়, ভিডিও বিশ্লেষণ কক্ষে। প্রযুক্তি শুধু প্রস্তুতিই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে রেফারিংও। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) বিতর্ক কমানোর চেষ্টা করেছে। সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিমিটারের ব্যবধানে সিদ্ধান্ত দিতে পারছে। গোললাইন প্রযুক্তি নিশ্চিত করছে বল পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেছে কি না।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়। প্রযুক্তি কি একজন ফুটবলারের চোখের জল বুঝতে পারে? জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় বুকের ভেতরের কাঁপন কি কোনো সফটওয়্যার মাপতে পারে? গ্যালারিতে বসে থাকা মায়ের প্রার্থনা কি কোনো অ্যালগরিদম বিশ্লেষণ করতে পারে? উত্তর ‘না’। ডেটা বলে দিতে পারে কোথায় পাস দিতে হবে। সেই পাস দেওয়ার সাহস আসে হৃদয় থেকে। প্রযুক্তি বলে দিতে পারে পেনালটি কোন দিকে মারলে গোল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। গোলকিপারের অসাধারণ সেভের আগে কম্পিউটার হয়তো বলে দেয় শট ডান দিকে যেতে পারে। শেষ মুহূর্তে ডান দিকে ঝাঁপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মানুষ। আধুনিক ফুটবল আর শুধু পায়ের খেলা নয়, এটি মস্তিষ্কেরও খেলা। যে দল তথ্যকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে, বিজ্ঞানকে সবচেয়ে দক্ষভাবে কাজে লাগাতে পারে, খেলোয়াড়দের শরীর ও মনকে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রস্তুত করতে পারে, তারাই এগিয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত ফুটবল তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ভুলে যায় না। শেষ বাঁশির পর একজন খেলোয়াড়ের চোখে জল আসে। একজন সমর্থক পতাকা বুকে জড়িয়ে কাঁদেন। শিশু বাবার কাঁধে বসে প্রথম শেখে জয়ের অর্থ। পরাজিত অধিনায়ক নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই মুহূর্তগুলো কোনো সফটওয়্যার তৈরি করে না।
প্রযুক্তি ফুটবলকে দ্রুত, নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক করেছে। এখানে অ্যালগরিদম কৌশল বানায়, ডেটা ভুল ধরিয়ে দেয়, পরিকল্পনা সাজায়। ইতিহাস লেখে মানুষের সাহস, স্বপ্ন আর আবেগ। ফুটবল বদলে গেছে। ৪-৩-৩ কিংবা ৪-৪-২ এখন আর পুরো গল্প নয়। বিশ্বকাপে অদৃশ্য একাদশে খেলছে ডেটা, জিপিএস, ভিডিও বিশ্লেষণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। শেষ বাঁশি বাজলে বিজয়ীর চোখের জল আর পরাজিতের দীর্ঘশ্বাসই সব প্রযুক্তির ঊর্ধ্বে। ফুটবল এখনো মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে সুন্দর খেলা।








